আক্বিদা

নামাজে গাউসিয়া নিয়ে আহমদ রিদা খান বেরলভীর বিরুদ্ধে মিজান হারুনের অপপ্রচার ও মিথ্যাচার (৩য় পর্ব)

Ijharul Islam শনি, 27 মে, 2023
35

ব্রেলভীদের খন্ডন করতে গিয়ে মাওলানা মিজান হারুন আহমদ রেজা খান বেরলভীর উপর ‘সুস্পস্ট শিরক’ এর অভিযোগ এনেছেন। সুস্পষ্ট শিরক বলতে যদি তিনি শিরকে আকবর ( বড় শিরক), শিরকে জলী ( সুস্পষ্ট বা প্রকাশ্য শিরক) উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন, তাহলে এটি গুরুতর একটি অভিযোগ। এধরণের বড় শিরকের মাধ্যমে খোদ আহমদ রিদা খান মুসলমান ছিলেন নাকি মুশরিক সেই প্রশ্ন এসে পড়ে। সুস্পষ্ট শিরক দ্বারা মাওলানা মিজান হারুনের উদ্দেশ্য যদিও নজদীদের মতো বড় শিরকের অভিযোগ করে আহমদ রিদ্বা খানকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়া, তবে এখানে তার ব্যাখ্যার সুযোগ আমরা রাখছি। আশা করি, তিনি তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। আশ্বর্য্যের বিষয় হলো, তার এই আলোচনার পাঠকগণও তার আলোচনা থেকে ‘সুস্পষ্ট শিরক’  দ্বারা বড় শিরক উদ্দেশ্য নিয়েছেন। বেশ কয়েকজন কমেন্টও করেছেন আহমদ রিদ্বা খানকে বড় শিরকের অভিযোগ করে। মাওলানা মিজান হারুন সাহেব সেখানেও কোন প্রতিবাদ করে বলেননি যে, সুস্পষ্ট শিরক দ্বারা আমি বড় শিরক উদ্দেশ্য নেইনি, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এর অর্থ হলো, তার বক্তব্য ও তার পাঠকদের বক্তব্যও কাছাকাছি। অর্থাৎ সালাতে গাউসিয়ার মাধ্যমে আহমদ রিদ্বা খান বা তার অনুসারীরা বড় শিরক করেছেন। এটি তাদের অভিযোগের মূল বিষয়। 


 

এখানে বলে নেয়া প্রয়োজন যে, মিজান হারুন সাহেব আহমদ রিদ্বা খানের পক্ষ থেকে উলামায়ে দেওবন্দের উপর তাকফির হওয়ার কারণে বেশ কিছু আবেগঘণ পোস্ট দিয়েছেন। আবার এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিনি নিজেই সেই আহমদ রিদ্বা খানের উপর সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ আনছেন। আপনার কাছে যিনি সুস্পষ্ট শিরককারী, সেই যদি আপনার পছন্দনীয় কাউকে কাফের বলে এতে আশ্চর্য্য হওয়ার কী আছে? হুকুমের দিক থেকে মাওলানা মিজান হারুনের পক্ষ থেকে দেয়া অভিযোগ অর্থাৎ শিরকের অভিযোগ বেশি গর্হিত কুফর থেকে। এক দিকে আহমদ রিদ্বা খানের পক্ষ থেকে তাকফির হলে সেটাকে খুব বড় করে উপস্থাপন করছেন আবার সেই তিনিই খোদ আহমদ রিদ্বা খানের উপর সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ করছেন। কারও উপর শিরক বা কুফরের অভিযোগ যদি গুরুতর বিষয় হয়, তাহলে তিনি নিজেও সেই একই কাজ করেছেন, যেই কাজের জন্য তিনি অন্যকে অভিযোগ করছেন। বেরলভীরা যদি দেওবন্দীদেরকে তাকফির করে থাকে, তাহলে খোদ মিজান হারুন বেরলভীদের উপর সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ এনে একই কাজ করেছেন। ফলাফলের দিক থেকে উভয়ের কাজ সমান। 

 

আমাদের আজকের পর্যালোচনায় আমরা দেখব, আহমদ রিদ্বা খানের উপর মিজান হারুন যে সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ এনেছেন এর বাস্তবতা আসলে কী? আহমদ রিদ্বা খান কি এমন কিছু বলেছেন বা করেছেন যা তার সুস্পষ্ট শিরকের প্রমাণ হতে পারে? এখানে মিজান হারুন কি অন্যায়ভাবে আহমদ রিদ্বা খানের উপর শিরকের অভিযোগ এনেছেন? নাকি বাস্তবেই আহমদ রিদ্বা খান সুস্পস্ট শিরক করেছেন?

 

এই প্রশ্নের উত্তরের আগে চলুন মাওলানা মিজান হারুনের বক্তব্য দেখে নেয়া যাক। মাওলানা মিজান হারুন লিখেছেন,

 

ব্রেলভীদের নামাযে গাউসিয়্যাহ

ব্রেলভীদের একটি নামাযের নাম হলো 'নামাযে গাউসিয়্যাহ' বা 'গুপ্ত নামায' (صلاة الأسرار)। আব্দুল কাদের জীলানীর কাছে সাহায্যপ্রার্থনার জন্য এই নামায পড়া হয়। ‘নামাযে গাউসিয়্যাহ’ এর পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আহমদ ব্রেলভী আব্দুল কাদের জীলানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন এভাবে: قال سيدنا ومولانا الغوث الأعظم رضي الله تعالى عنه: من توسل بي في شدة فرجت عنه، ومن استغاث بي في حاجة قضيت له، ومن صلى بعد المغرب ركعتين، ثم يصلي ويسلم على النبي صلى الله تعالى عليه وسلم، ثم يخطو إلى جهة العراق احدى عشرة خطوة، يذكر فيها اسمي قضى الله تعالى حاجته অর্থাৎ ‘আমাদের সাইয়্যেদ ও মাওলানা, গাউসুল আজম রাযিয়াল্লঅহু আনহু বলেন, ‘যে ব্যক্তি সংকটের সময় আমার উসিলা গ্রহণ করে আমি তার সংকট দূর করে দিই। আর যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, আমি তার প্রয়োজন পূর্ণ করি দিই। আর মাগরিবের নামাজের পরে যে ব্যক্তি দুই রাকাআত নামাজ পড়বে। রাসূলুল্লাহর ওপর দরূদ পড়বে। অতঃপর ইরাকের দিকে এগারো কদম অগ্রসর হতে হতে মুখে আমার নাম যপবে। আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করে দিবেন’  [ফাতাওয়া: ৭/৬৩৮] এটাকেই বলা হয় নামাযে গাউসিয়্যাহ। [অবশ্য এই বক্তব্য জীলানী র. এর ওপর মিথ্যাচার। এটা আবিষ্কার করেছেন তার জীবনীকারক শাতনূফী]

ব্রেলভী বলেন, ‘এগুলো করার সময় ধ্যান করবে যেন সে বাগদাদে আছে। হযরতের কবর তার চোখের সামনে। তিনি কিবলামুখী হয়ে শুয়ে আছেন। বান্দা তার অনুগ্রহ চাওয়ার ইচ্ছা করবে। কিন্তু অপরাধবোধ ও লজ্জার কারণে চাইতে পারবে না। ফলে তখন পেরেশান থাকবে। যেন তার কাছে অনুমতি চাইবে। তার সাগরসম উদারতা ও তার ‘আমার প্রত্যাশী ভালো না হলেও আমি ভালো’- এই সুসংবাদের সুবাদে তার কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করতে চাইবে। এই দ্বিধাদ্বন্দের মাঝেই যেন গউসে আজম তার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন। তার দুরবস্থা ও লজ্জা দেখবেন। পাপী বান্দার প্রতি দয়াপরবশ হবেন এবং সুপারিশ করবেন। যেন তিনি বলবেন, ‘আমি তাকে সামনের কদমগুলো পূর্ণ করার অনুমতি দিচ্ছি’। তখন সে আমার নাম যপবে। আমার কাছে গুনাহের কারণে ভয় পাবে না। কারণ আমি তার জামিনদার। তার দুনিয়া ও আখিরাতের সবকিছুর অভিভাবক। বান্দা তখন উদ্দীপ্ত হবে। প্রচণ্ড ভাবাবেগে সামনে অগ্রসর হবে আর প্রতি কদমে বলতে থাকবে, ‘হে জ্বিন ও ইনসানের মুক্তিদাতা! হে দয়ালু পুণ্যাত্মা! আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করুন! হে প্রয়োজন পূর্ণকারী! আমার প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করুন’ (ويذكر فيها اسمي ولا يخشى المعاصي عندي، فإني أنا ضمينه وكفيل مهماته في الدنيا والآخرة، فينشط العبد ويتقدم على أقدام الوجد قائلا على كل خطوة: يا غوث الثقلين، ويا كريم الطرفين، أغثني، وأمددني في قضاء حاجتي يا قاضي الحاجات)!!! [ফাতাওয়া: ৭/৬৪৬-৬৪৭]

ইন্নালিল্লাহ! জীলানী জ্বিন ও ইনসানের মুক্তিদাতা। প্রয়োজনপূর্ণকারী। তাহলে আল্লাহর জন্য তারা কী বাকি রেখেছে? আল্লাহ বলেছেন, ‌'তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো‌' [মুমিন: ৬০] আর তারা শেখাচ্ছে আব্দুল কাদের জীলানীকে ডাকতে। এগুলো সুস্পষ্ট শিরক। অপব্যাখ্যাকারীদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দিন।

 

বক্তব্যের স্ক্রিনশট:

 

 

 





 


 

মিজান হারুন সাহেব শুরুতে লিখেছেন, “আব্দুল কাদের জীলানীর কাছে সাহায্যপ্রার্থনার জন্য এই নামায পড়া হয়।” 

তার এই বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ নিলে একজন পাঠকের কাছে খুব নিকৃষ্ট একটি অর্থ বুঝে আসে। তিনি কেমন যেন বোঝাতে চান, আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য নামাজ পড়া হচ্ছে। যদিও আমাদের এই পর্যালোচনার পর খুবই সম্ভাবনা আছে, তিনি বলবেন, আমি উক্ত কথার বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নেয়নি। যদিও তার পাঠকরা কিন্তু ঠিকই এই নিকৃষ্ট অর্থটি বুঝেছে। এবং স্বাভাবিকভাবে কেউ যদি তার লেখা পড়ে, বাহ্যিকভাবে এটিই বুঝে আসে যে, আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য নামাজ পড়া হচ্ছে। এজন্য মিজান হারুনের এক ভক্ত পাঠক আবু হাফসা লিখেছে, 

 

 

 

 

শিরক মিশ্রিত সালাত আবার কী জিনিস? হয়ত এখানে শিরক-মিশ্রিত সালাত বলতে আসলে মিজান হারুন সাহেবের উপরের বক্তব্য থেকে বোঝা নিকৃষ্ট অর্থটি উদ্দেশ্য। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য নামাজ পড়া হচ্ছে। আর আমরা সবাই জানি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য যে কোন প্রকারের ইবাদত সুস্পষ্ট শিরক। সেই ইবাদত যদি নামাজ হয়, তাহলে সেটি শিরক হওয়ার ক্ষেত্রে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। মিজান হারুন সাহেব যেভাবে লিখেছেন, এতে এই ধরণের একটি নিকৃষ্ট শিরকের অভিযোগ ওঠে আহমদ রেজা খান বেরলভী ও তার অনুসারীদের উপর। যদিও মিজান হারুন সাহেব তার বক্তব্যকে বাহ্যিক অর্থে নিয়ে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে এই দাবী করতে পারেন, এজন্য তার বক্তব্যের ব্যাখ্যার দায় তার উপর রেখেই আমরা পরবর্তী আলোচনায় যাব। আমরা চাই, তিনি নিজেই তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিক। তবে যারা তার বক্তব্য থেকে এধরণের শিরকী অর্থ বুঝে আহমদ রেজা খানের উপর অন্যায়ভাবে শিরকের অভিযোগ করেছে, তাদের ভুল ধারণা অপনোদন করা জ্বরুরি। 

 

শুরুতেই দু’টি মূলনীতি বুঝে নেয়া দরকার। 

 

১। ইসলামে ছোট-বড় যে কোন ধরণের ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট। যে কোন ইবাদতই আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা শিরক। সেই ইবাদত ছোট হোক কিংবা বড় হোক। ইবাদতের নিয়তে যে কোন কাজ গাইরুল্লাহর জন্য করা শিরক।আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন নবী, রাসূল, গাউস, কুতুব কারও জন্য কোন প্রকার ইবাদত করার সুযোগ নেই। 

 

২। শরীয়াতে বিভিন্ন ইবাদত, আমল, ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে দু’য়া করার মাধ্যম বা ওসিলা হিসেবে গ্রহণ করা স্বীকৃত। খোদ কুরআনেই আল্লাহ তায়ালা ওসিলা গ্রহণের কথা বলেছেন। এজন্য নামাজ, রোজাসহ বিভিন্ন আমলকে আল্লাহর নিকট ওসিলা হিসেবে পেশ করার অনুমতি রয়েছে। এবং এধরণের ওসিলা গ্রহণের বিষয়ে পুরো উম্মতের ইজমা রয়েছে। নজদী-তাইমীরা ওসিলার কিছু প্রকারকে অস্বিকার করলেও মৌলিক ওসিলাকে তারাও স্বীকার করে। 

 

শরীয়াতের এমন কিছু আ’মলের নির্দেশনা রয়েছে যেগুলোর বাহ্যিক নাম দেখলে মনে হবে এটি গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদত করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, এগুলোর ক্ষেত্রে মূল ইবাদত আল্লাহর জন্যই করা হচ্ছে। তবে সেই ইবাদতকে সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণের ওসিলা হিসেবে আল্লাহর কাছে পেশ করা হচ্ছে। যেমন, সালাতুল ইস্তিসকা। বা বৃষ্টির জন্য বিশেষ নামাজ। 

 

বৃষ্টির জন্য নামাজের অর্থ কী? যদি বাহ্যিক অর্থ নেন, তাহলে এটি খুব নিকৃষ্ট একটি অর্থ হবে। অর্থাৎ গাইরুল্লাহ তথা বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়া হচ্ছে। আর আমরা জানি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর জন্য ইবাদত শিরক। তাহলে কি বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়া শিরক? কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে নাউজুবিল্লাহ একথা  বলতে পারে,  গ্রহ-নক্ষত্র বা মেঘের জন্য নামাজ পড়া হচ্ছে, যাতে বৃষ্টি হয়। 

 

এভাবে বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ নিলে শিরক সাব্যস্ত হয়। কিন্তু শরীয়াতে আসলে বিষয়টিকে এই নিকৃষ্ট অর্থ নেয়ার জন্য সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং সালাতুল ইস্তিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ দ্বারা এমন নামাজ উদ্দেশ্য যা আল্লাহর জন্যই পড়া হয়েছে। নামাজ বা ইবাদত হয়েছে একমাত্র আল্লাহর জন্য। কিন্তু এখানে উক্ত নামাজকে বৃষ্টির প্রয়োজন পূরণের জন্য আল্লাহর কাছে ওসিলা হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। 



 

একইভাবে সালাতুল হাজাহ বা প্রয়োজন পূরণের নামাজ। সালাতুল কুসুফ বা সূর্যগ্রহণের নামাজ। সূর্যগ্রহণের নামাজ দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, সূর্যগ্রহণের জন্য কিংবা সূর্য্যের জন্য ইবাদত করা হচ্ছে। বরং নামাজ পড়া হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য। এবং এই নামাজের ওসিলায় আল্লাহর কাছে সূর্য্যগ্রহণের মতো একটি বিপদের বিষয় থেকে হেফাজত চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাহ্যিক অর্থ নিলে এখান থেকে একটি নিকৃষ্ট অর্থ বের হয়। যা শিরক বোঝায়। একইভাবে সালাতুল খুসুফ বা চন্দ্রগ্রহণের নামাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

 

ইস্তিখারা, হাজত, কুসুফ, খুসুফ, ইস্তিসকা এভাবে আল্লাহ ছাড়া গাইরুল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করে যত নামাজের কথা শরীয়াতে আছে, সব ক্ষেত্রেই মূল ইবাদত আল্লাহর জন্য করা হচ্ছে। সেই ইবাদতকে আল্লাহর কাছে ওসিলা হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। 

 

এখানে কেউ যদি বাহ্যিক শব্দের ব্যবহার থেকে গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদত বা শিরক সাব্যস্ত করে, তাহলে তার  বক্তব্য খন্ডনের পূর্বে তার আক্বল-বুদ্ধির চিকিৎসা প্রয়োজন। 

 

এবার আসুন সালাতুল গাউসিয়া নিয়ে আলোচনা করা যাক। সালাতুল গাউসিয়া এর অর্থ কী? আব্দুল কাদের জিলানীর জন্য নামাজ পড়া কিংবা মাওলানা মিজান হারুনের ভাষায় আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্যের জন্য নামাজ পড়া? 

 

এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ ছাড়া আব্দুল কাদের জিলানী বা অন্য কারও ইবাদতের জন্য নামাজ পড়া বড় শিরক। এধরণের কাজের মাধ্যমে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। প্রশ্ন  হলো, সালাতুল গাউসিয়াতে কি আল্লাহর জন্য নামাজ পড়া হয় নাকি আব্দুল কাদের জিলানীর জন্য পড়া হয়?

 

মাওলানা মিজান হারুনের বাহ্যিক বক্তব্য থেকে বোঝা যায় (যদিও তিনি তার বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার সম্ভাবনা আছে) এটি আব্দুল কাদের জিলানীর জন্য পড়া হয়। নাউজুবিল্লাহ। মাওলানা লিখেছেন,

“ব্রেলভীদের একটি নামাযের নাম হলো 'নামাযে গাউসিয়্যাহ' বা 'গুপ্ত নামায' (صلاة الأسرار)। আব্দুল কাদের জীলানীর কাছে সাহায্যপ্রার্থনার জন্য এই নামায পড়া হয়।”

 

আমাদের অনুসন্ধানের বিষয় হলো, মাওলানা মিজান হারুনের উপরের বক্তব্যটি কতটুকু বাস্তব? আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী বা তাদের অনুসারীরা কি এই নামাজকে আল্লাহর ইবাদত ছাড়া আব্দুল কাদের জিলানীর সাহায্য পাওয়ার জন্য পড়ে থাকে? 

 

চলুন, খোদ আহমদ রিদ্বা খানের বক্তব্য থেকেই এর জওয়াব নেয়ার চেষ্টা করি। আমি এখানে আহমদ রিদ্বা খানের বক্তব্যটি দীর্ঘ হলেও সম্পূর্ণ বক্তব্যের মূল অংশগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাতে পুরো বিষয়টা পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়।  

 

আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী লিখেছেন, 

 

“সালাতুল আসরারের পদ্ধতি হলো, কোন ব্যক্তির যদি দ্বীনি বা দুনিয়াবী কোন প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সে মাগরিবের নামাজের পরে মাগরিবের সুন্নতের সাথে দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে।  সালাতুল আসরারের নিয়ত করে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে (তাকাররুবান ইলাল্লাহ) এটি আদায় করবে এবং এই নামাজের সওয়াবের হাদিয়া গাউসে আজম আব্দুল কাদের জিলানীর রুহের জন্য পাঠাবে। যদি এর জন্য নতুন ওজু করে তাহলে ভালো। কারণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক অন্ধ সাহাবির চোখের সুস্থ্যতার জন্য যেই সালাতুল হাজত পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেখানে নতুন ওজুর কথা বলেছিলেন। যদিও এখানে নতুন ওজু না করার সুযোগ আছে। যদি ওজু করে তাহলে ভালোভাবে করবে। কারণ, অন্ধ সাহাবিকে এমন নির্দেশ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন। আমার কাছে পছন্দনীয় হলো, সালাতুল আসরার পড়ার পূর্বে কিছু দান - সাদকা করবে। কারণ, এটি দু’য়া কবুলের জন্য দ্রুততর মাধ্যম। এবং বালা-মুসিবতের দরজা বন্ধের ওসিলা। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কোন কিছু জিজ্ঞাসা বা চাওয়ার পূর্বে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সদকা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং আল্লাহর কাছে কোন কিছু চাওয়ার পূর্বে সাদকা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে সামগ্রিকভাবে সালাতুল আসরারে নবীজীর কাছে চাওয়ার বিষয়ও আছে। নবীজীর কাছে জিজ্ঞাসা বা চাওয়ার পূর্বে সাদকা করার আয়াতটির ওয়াজিব বিধান আল্লাহর রহমত হিসেবে রহিত হলেও এটি মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। 

 

নামাজে সূরা ফাতিহার পরে যদি এগারবার সূরা ইখলাস পাঠ করে তাহলে এটি উত্তম। নামাজের সালাম শেষে আল্লাহর শান মোতাবেক তার হামদ ও সানা (গুণকীর্তন) করবে। এক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত শব্দে হামদ - সানা করা উত্তম। কারণ, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো অন্য কেউ আল্লাহর প্রসংশা করতে সক্ষম নয়। হামদের ভেতরে সুন্দর একটি হামদ হলো, 

الحمدلله حمدا كثيرا طيبا مباركا فيه ملء السموات وملء الارض وملء مابينهما وملء ماشئت من شئ بعد

 

অথবা এটি পড়বে,

 اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا دَائِمًا مَعَ خُلُودِكَ ، وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا لا مُنْتَهَى لَهُ دُونَ مِشْيَتِكَ ، وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا لا يَزِيدُ قَائِلُهَا إِلا رِضَاكَ ، وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا مَلِيًّا عِنْدَ كُلِّ طَرْفَةِ عَيْنٍ وَتَنَفُّسِ نَفَسٍ


 

অথবা 

اللَّهُمَّ لَكَ الحَمْدُ كَمَا يَنْبَغِي لِجَلَالِ وَجْهِكَ وَعَظِيمِ سُلْطَانِكَ

 

اللهم لك الحمد شكرا ولك المن فضلا

 

অথবা, 

اللهم لك الحمد كالذي نقول وخيرا مما نقول

 

অথবা এজাতীয় যতো হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর কোন একটি পড়বে। এক্ষেত্রে সবগুলো জমা করে পড়তে পারে অথবা এগুলোর কিছু কিছু পড়তে পারে। আমার পছন্দ হলো, হামদ - সানা শেষ করবে এর মাধ্যমে, কারণ এটি আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা জমা করে এবং এটি প্রশংসার মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক পর্যায়ের। 

 

اللهم لا أحصي ثناء عليك أنت كما أثنيت على نفسك

 

যে উপরের কোনটি ভালোভাবে পারে না সে শুধু তিনবার আল-হামদুলিল্লাহ পড়বে। অথবা আল্লাহর প্রশংসার নিয়তে সূরা ফাতিহা অথবা আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। কারণ এগুলোর চেয়ে অধিক প্রশংসার কোন কিছু সে করতে পারবে না। 

 

এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ১১ বার দুরুদ ও সালামের হাদিয়া পেশ করবে। কারণ, আল্লাহর কাছে নবীজীর উপর দুরুদ পাঠ করা ছাড়া কোন দু’য়া কবুল হয় না। দুরুদের সাথে এখানে সালামও পেশ করবে। যাতে দুুরুদ ও সালাম উভয়টির ফজীলত হাসিল করতে পারে। আবার শুধু দুরুদ বা সালাম পেশ করার ক্ষেত্রে উলামাদের ইখতিলাফের বিষয় থেকে বাঁচার জন্য উভয়টি পাঠ করা উত্তম। কারণ, কিছু কিছু আলিম দুরুদ ও সালামের যে কোন একটা পড়াকে মাকরুহ বলেছেন।  

 

দুরুদ ও সালামের ক্ষেত্রে অধম (আহমদ রিদ্বা খান) এর পছন্দ হলো, এক্ষেত্রে আব্দুল কাদের জিলানী থেকে বর্ণিত দুরুদটি পড়বে। সেটি হলো, 

اللهم صل على سيدنا و مولانا محمد معدن الجود و الكرم و اله و سلم

অধম এই দুরুদকে এভাবে পড়ে থাকি,


 

اللهم صل على سيدنا و مولانا محمد معدن الجود و الكرم واله الكرام و ابنه الكريم و امته الكريمة يا اكرم الاكرمين و بارك و سلم

 

এরপর সে তার অন্তরকে মদিনার দিকে ধাবিত করবে এবং এগারবার বলবে, 

يا رسول الله يا نبي الله اعثني و امددني في قضاء حاجتي يا قاضي الحاجات

(অর্থ: হে আল্লাহর রাসূল, হে আল্লাহর নবী, আমার এই প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আপনি আমাকে সাহায্য করুন, মদদ করুন। হে নবী, আপনি প্রয়োজনসমূহ পূর্ণকারী) 

 

এরপর স্বাভাবিকভাবে ইরাকের দিকে এগার কদম হাটবে। (এরপর আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী হিন্দুস্তান থেকে ইরাকের দিক নিয়ে কিছু আলোচনা করেছেন। আমরা সেই আলোচনা এড়িয়ে গিয়েছি)। কারণ এটি স্বাভাবিক থাকা বাঞ্চনীয়। সাধারণ মানুষ যেভাবে করে সেভাবে নয়। অর্থাৎ তারা এক কদম বলতে কী উদ্দেশ্য সেটা বোঝে না। তারা প্রতি কদমে দুই চার আঙ্গুল অগ্রসর হয়। এটি আসলে কোন কদম নয়। এজন্য এখানে এক কদম হাটার কথা আছে। প্রয়োজন ছাড়া ভিন্ন কিছু করা এখানে ভুল। তবে যদি এমন জায়গায় থাকে যেখান হাটার সুযোগ নেই কিংবা বাহির কোন জায়গা নেই, তাহলে যতটুকু পারে ততটুকু করবে।  এর চেয়ে নিকৃষ্ট একটি বিষয় আমি দেখেছি সাধারণ মানুষের মাঝে, সেটি হলো, তারা নামাজ আদায় করে। এমনকি দ্বিতীয় রাকাতের ক্বিরাত শেষ করে নামাজের মধ্যেই ইরাকের দিকে এগার কদম অগ্রসর হয়। এরপর সেখান থেকে ফিরে এসে কেবলার দিকে ফিরে বাকী নামাজ আদায় করে। অথচ এই মিসকীন জানে না যে, এর দ্বারা তার নামাজই বাতিল হয়ে যায়। আর এটি আব্দুল কাদের জিলানী থেকে বর্ণিত পদ্ধতিরও বিরোধী। শরীয়াতে এভাবে কোন আমলকে বাতিল করা হারাম। আর নফল শুরু করলে সেটির কাজা করা ওয়াজিব। সে এটি জানেও না। এভাবে সে দ্বিগুন গুণাহের মধ্যে নিপতিত হয়। এধরণের লোকদেরকেই হাদীসে এসেছে, সঠিক ফিকহ না জেনে আমলকারী হলো সেই গাধার মতো যে আটা পিষতে পিষতে জীবন কাটিয়ে দেয়। এই লোকের চেয়ে তার যে শায়খ তাকে এই ধরণের আমলের কথা বলেছে সে বড় অপরাধী। লা হাউলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম। 

 

ইরাকের দিকে হাটার সময় আদব, ভয়, নম্রতা ও বিনয়ের সাথে অগ্রসর হবে। আমি পছন্দ করি সে যেন এই কল্পনা করে যে, সে কেমন যেন বাগদাদে উপস্থিত। আব্দুল কাদের জিলানীর কবর তার চোখের সামনে। তিনি কেবলামুখী হয়ে সেখানে শায়িত আছেন। অধম তার অনুগ্রহের আশাবাদী হয়ে তার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে তবে অধিক গোনাহের কারণে যেন লজ্জার আড়স্টতা তাকে গ্রাস করেছে। সে হয়রান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এরপর কেমন যেন সে তার কাছে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি চাচ্ছে এবং তার সুপারিশের আবেদন করছে। কারণ, তার বদান্যতা ও অনুগ্রহ প্রশস্ত। কারণ তিনি সুসংবাদ দিয়েছেন, আমার মুরিদরা যদি ভালো না থাকে তাহলে আমি কীভাবে ভালো থাকব?। 

সে এভাবে কল্পনা করবে যে, তিনি তাকে দেখছেন এবং তার দীনতা ও লজ্জার বিষয়টি জানেন। তখন তার বদান্যতা ও অনুগ্রহের কারণে তিনি গোনহগার অধম বান্দার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। কেমন যেন তিনি বলছেন, “এই অধম মিসকিনকে আমি ইরাকের দিকে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি দিয়েছি, সে আমার নাম স্মরণ করে। আমার কাছে তার গোনাহের ভয় করে না। তার দুনিয়া ও আখিরাতের চিন্তা-পেরেশানির দায়িত্বশীল ও জিম্মাদার আমি।”  এভাবে বান্দা নিজেকে প্রস্তুত করে ওয়াজদ অবস্থায় প্রতিটা কদম অগ্রসর হয়ে বলবে, 

يا غوث الثقلين و يا كريم الطرفين اغثني و امددني في قضاء حاجتي يا قاضي الحاجات

 

(অর্থ: হে উভয় জাহানের সাহায্যকারী, হে পিতৃ-মাতৃকুল উভয় দিক থেকে সম্মানিত, আপনি আমাকে আমার এই প্রয়োজন পূরণে সাহায্য ও সহযোগিতা করুন। আপনি প্রয়োজনসমূহ পূর্ণকারী) 

 

এরপর সাইয়্যিদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসিলায় এবং তার এই সম্মানিত সন্তান গাউসুল আজমের ওসিলায় আল্লাহর কাছে দু’য়া করবে। আর দু’য়ার শব্দসমূহের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম যেসব দু’য়ার আদব লিখেছেন সেগুলো রক্ষা করবে। বিশেষ করে হিসনে হাসীন সহ অন্যান্য দু’য়ার কিতাবে যা বর্ণিত হয়েছে। দুয়ার ফজীলত ও বিভিন্ন দু’য়া সংকলনের ক্ষেত্রে আমার সম্মানিত পিতা ইমামুল মুহাক্কিকীন মাওলানা নকী আলী খান একটি সুন্দর কিতাব লিখেছেন। এর নাম দিয়েছেন, আহসানুল বিয়া লি-আদাবিদ দু’য়া। আমি জাওয়াহিরুল বায়ান ফি আসরারিল আরকান কিতাবের হজ্বের অধ্যায়ে এর সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেছি।  

 

আল্লাহর কাছে দু’য়ার ক্ষেত্রে ইয়া আরহামার রাহিমীন তিনবার বলে শুরু করবে। কারণ, যে এটি বলবে, এর জন্য নির্ধারিত একজন ফেরেশতা তাকে ডাক দিয়ে বলবে আরহামুর রহিমীন তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এবং ইয়া বাদীয়াস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ইয়া জাল জালালি ওয়াল ইকরাম পড়বে। কারণ একটি বর্ণনা অনুযায়ী এটি ইসমে আজম। একইভাবে দু’য়ায়ে ইউনুস পাঠ করবে। তিনবার আমীন বলে দু’য়া শেষ করবে। কারণ এটি দু’য়া শেষ করার বাক্য এবং আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে উম্মতে মুহাম্মাদীকে এটি দান করেছেন। সেই সাথে খাতামুন নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করবে এবং শেষে হামদ পাঠ করবে। যাতে করে তার দু’য়ার শুরু ও শেষ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদের মাধ্যমে হয়। কারণ দু’য়া হলো পাখির মতো। এই পাখির ডানা হলো দুরুদ। সুতরাং দুরুদের মাধ্যমে দু’য়ার ডানা পরিপূর্ণ হয়। আর যেহেতু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ পাঠ করা নি:সন্দেহে কবুল হয়, এজন্য কোন দু’য়ার উভয় প্রান্ত যদি কবুল হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তায়ালার অধিক দয়ার কারণে মাঝের দু’য়াগুলি কবুলের ব্যাপারেও আশা করা যায়। আর দু’য়া যেন বেজোড় হয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বেজোড়, তিনি বেজোড় পছন্দ করেন। প্রত্যেক দু’য়ার পরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ পাঠ করবে। কারণ দু’য়া কবুলের জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ পাঠের চেয়ে অধিক কার্যকরী কোন কিছু নেই। আর চেষ্টা করবে যেন চোখ দিয়ে অশ্রু বের হয়। কারণ এটি দু’য়া কবুলের আলামত। যদি কান্না না আসে, তাহলে কান্নার ভান করবে। কারণ, যে যাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে সে তাদের অন্তর্ভূক্ত হবে। দু’য়া করার সময় আমার কাছে পছন্দনীয় হলো, ইরাকের দিকে মুখ করে থাকবে। কারণ এটি তার জন্য সুপারিশকারীদের দিক। তার জন্য তখন কেবলামুখী হওয়া জ্বরুরি নয়। দ্বিতীয় আব্বাসী খলিফা আবু জা’ফর মানসুর  মদিনার শ্রেষ্ঠ আলিম ইমাম মালিককে জিজ্ঞেস করেন, হে মালিক, আমি কি দু’য়ার সময় কেবলামুখী হয়ে দু’য়া করব নাকি নবীজীর দিকে মুখ করে দু’য়া করব? তখন ইমাম মালিক রহ: বলেন, আপনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুখ ঘোরাবেন কেন? তিনি তো আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন আপনার ও আপনার আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের ওসিলা।  বরং আপনি তার দিকে মুখ করে থাকুন, তাকে সুপারিশকারী বানান। আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য তার সুপারিশ কবুল করবেন। 

মোটকথা, যে ব্যক্তি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে, আল্লাহর কাছে তাড়াহুড়া করা যেমন বলল যে, আমি দু’য়া করলাম, কবুল হলো না, এগুলো করা ব্যতিরেকে দু’য়া করবে, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করে দিবেন। তবে শর্ত হলো এক্ষেত্রে কোন গোনাহ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। 

(ফতোয়ায়ে রিদাভিয়্যা, খ: ৭, পৃ: ৬৩৯-৬৫২) 


 










 

 


 




 

 

 

 




 

 




 





 

আহমদ রিদ্বা খানের এই দীর্ঘ বক্তব্য উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্য হলো, এই বক্তব্য থেকে যেভাবে মাওলানা মিজান হারুন ‘সুস্পষ্ট শিরক’ বের করার চেষ্টা করেছেন, সেটি আদৌ এখানে পাওয়া যায় কি না। আমরা শুরুতেই বলেছি, মাওলানা মিজান হারুন সালাতুল গাউসিয়াকে যেভাবে আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্যের জন্য নামাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, আসলে বিষয়টি এমন নয়। মূল নামাজ পড়া হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য। যেটি আহমদ রিদ্বা খান খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, নামাজটি তাকাররুবান ইলাল্লাহ বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বা আল্লাহর ইবাদতের জন্য পড়বে। সুতরাং সালাতুল গাউসিয়াকে আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্য প্রার্থনার নামাজ হিসেবে উপস্থাপন সঠিক নয়। বরং এখানে ব্যক্তি তার প্রয়োজন পূরণের জন্য, নামাজ, দুয়া-দুরুদ, নবীজীর কাছে ইস্তিগাছা, আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে ইস্তিগাছা সবই করছে ওসিলা হিসেবে। উপরের কোনটায় সরাসরি মৌলিক উদ্দেশ্য নয়। বরং সব কিছুই ওসিলা হিসেবে করা হচ্ছে। যা খোদ আহমদ রিদ্বা খান আলোচনার কয়েক জায়গায় স্পষ্ট করে লিখেছেনও। এবং সর্বশেষ তিনি বলেছেন, ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করবেন আল্লাহ তায়ালা। এখানে আব্দুল কাদের জিলানীকেও সরাসরি প্রয়োজন পূরণকারী সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং সকল আমল ও ওসিলার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রয়োজন পূরণ করবেন সেটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে। 

 

মাওলানা মিজান হারুন যেই ফতোয়ায়ে রেজভিয়া থেকে তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি এনেছে সেখানেই বিষয়গুলো স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ইলমি আমানতের দাবী ছিলো, আহমদ রিদ্বা খানের এধরণের স্পষ্ট বক্তব্য উদ্ধৃত করা। যার মাধ্যমে শিরক সহ যে কোন ধরণের অপবাদের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখানে মাওলানা মিজান হারুন সচেতনভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এমন একটি বক্তব্য লিখেছেন, যাতে মানুষের ধারণা শিরকের দিকে যায়।  তিনি হয়ত দাবী করতে পারেন, কারও বক্তব্যের সব কিছু তো উদ্ধৃত করা জ্বরুরি নয়। কিন্তু এধরণের তা’বীল এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এই আলোচনার মৌলিক অংশ যার মাধ্যমে পুরো বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যেত, সেটি এড়িয়ে গিয়ে আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে সাহায্য প্রার্থনার জন্য নামাজ পড়া হয়, এজাতীয় একটি বাহ্যিক শিরকী বক্তব্য দিয়ে পুরো বিষয়টাকে তিনি ধোয়াশাপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। 

 

এধরণের আরেকটি ইলমী আমানতের পরিপন্থী  শুরুতে সালাতুল গাউসিয়ার পদ্ধতি করতে গিয়ে। তিনি লিখেছেন,

 

“ ‘নামাযে গাউসিয়্যাহ’ এর পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আহমদ ব্রেলভী আব্দুল কাদের জীলানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন এভাবে: قال سيدنا ومولانا الغوث الأعظم رضي الله تعالى عنه: من توسل بي في شدة فرجت عنه، ومن استغاث بي في حاجة قضيت له، ومن صلى بعد المغرب ركعتين، ثم يصلي ويسلم على النبي صلى الله تعالى عليه وسلم، ثم يخطو إلى جهة العراق احدى عشرة خطوة، يذكر فيها اسمي قضى الله تعالى حاجته অর্থাৎ ‘আমাদের সাইয়্যেদ ও মাওলানা, গাউসুল আজম রাযিয়াল্লঅহু আনহু বলেন, ‘যে ব্যক্তি সংকটের সময় আমার উসিলা গ্রহণ করে আমি তার সংকট দূর করে দিই। আর যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, আমি তার প্রয়োজন পূর্ণ করি দিই। আর মাগরিবের নামাজের পরে যে ব্যক্তি দুই রাকাআত নামাজ পড়বে। রাসূলুল্লাহর ওপর দরূদ পড়বে। অতঃপর ইরাকের দিকে এগারো কদম অগ্রসর হতে হতে মুখে আমার নাম যপবে। আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করে দিবেন’  [ফাতাওয়া: ৭/৬৩৮] এটাকেই বলা হয় নামাযে গাউসিয়্যাহ।” 

 

এই বক্তব্যেটি আহমদ রিদ্বা খানের সম্পূর্ণ বক্তব্য নয়। এখানে মাওলানা মিজান হারুন যদি আহমদ রিদ্বা খানের সম্পূর্ণ বক্তব্যটি তুলে ধরতেন, তাহলে আলোচনার শেষে তিনি যেভাবে আহমদ রিদ্বা খানের উপর ‘সুস্পষ্ট শিরকের’ অভিযোগ এনেছেন, সেই অভিযোগ আনার সুযোগ থাকত না। স্পষ্টত: এখানে মিজান হারুন সাহেব শিরক হওয়া বা না হওয়ার মূল বিষয়গুলোকে  আহমদ রিদ্বা খানের বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত না করে তার উপর শিরকের অভিযোগ চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। যা কোন আমানতদার আলিমের জন্য শোভনীয় হতে পারে না। 

 

চলুন ফতোয়ায়ে রিদাভিয়্যা থেকে আহমদ রিদা খানের সম্পূর্ণ আলোচনাটি দেখা যাক। 

 

“ সালাতুল আসরার এর মূল বিভিন্ন সনদে খোদ আব্দুল কাদের জিলানী থেকে প্রমাণিত। যেমনটি উলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন। উলামায়ে কেরামের মধ্য থেকে ইমাম আবুল হাসান নুরুদ্দীন শাত্তানূফী তার ‘বাহজাতুল আসরার’ নামক কিতাবে, শাফেয়ী মাজহাবের আরেক বিখ্যাত ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আসআদ ইয়াফেয়ী, হানাফী মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী, উলামায়ে হিন্দের শাইখুল মাশাইখ মুহাক্কিক আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ: আব্দুল কাদের জিলানী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। 

গাউসে আজম আব্দুল কাদের জিলানী বলেছেন, কোন মুসীবতে যে আমার ওসিলা দিবে তার মুসীবত দূর করা হবে। কোন প্রয়োজনে কেউ আমার কাছে সাহায্য চাইলে তার প্রয়োজন পূরণ করা হবে। যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজের পর দু’রাকাত নামাজ পড়বে, এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরুদ ও সালাম পেশ করবে, এরপর ইরাকের দিকে এগার কদম অগ্রসর হওয়ার সময় আমার নাম স্মরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন।

 

আমি (আহমদ রিদ্বা খান) বলব, মুসীবত দূর করা হবে কিংবা আমি মুসীবত দূর করব, উভয় শব্দেই আরবীতে বক্তব্যটি পড়া যেতে পারে। শাহ আবুল মা’য়ালী তুহফায়ে কাদেরিয়াতে আমি প্রয়োজন পূরণ করব এই শব্দে উক্ত বক্তব্যের অর্থ করেছেন। তবে যেভাবেই বলা হোক, উভয়ের উদ্দেশ্য এক। প্রয়োজন পূরণ করা হবে যদি উদ্দেশ্য নেয়া হয়, তাহলে অর্থ ও উদ্দেশ্য হবে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন পূরণ করার মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনি প্রয়োজন পূরণ করবেন। আর যদি আমি প্রয়োজন পূরণ করব এটি উদ্দেশ্য নেয়া হয়, তাহলে সেটি বাহ্যিক কারণ হিসেবে আল্লাহর প্রদত্ত ক্ষমতা ও অনুমতিতে সৃষ্টিকে মাধ্যম ধরা হবে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন পূরণের মূল বিষয়টি আল্লাহর দিকে ন্যস্ত হবে যেভাবে খোদ আব্দুল কাদের জিলানী বিষয়টিকে আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করেছেন এই বলে যে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। কারণ সব কিছুর চূড়ান্ত মালিক হলেন আল্লাহ তায়ালা”। 

 

আব্দুল কাদের জিলানীর বক্তব্যে প্রয়োজন পূরণের যে কথাটি রয়েছে সেই কথার ব্যাখ্যায় উপরে আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী শিরক হওয়া বা না হওয়ার মানদন্ড সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। সেটিকে আরও স্পষ্ট করার জন্য টীকাতে আরও স্পষ্ট বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, 

“ বাস্তবে হাকিকী-বাতেনীভাবে প্রয়োজন পূরণের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ংস্পূর্ণভাবে কারও দান কিংবা কারও নির্ধারণ ব্যতীত স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন পূরণ করা উদ্দেশ্য। এটি শুধুমাত্র আল্লাহর গুণের সাথেই নির্দিষ্ট।”

 

তিনি আরও লিখেছেন,

“ বাহ্যিকভাবে কারও প্রদত্ত ক্ষমতায় প্রয়োজন পূরণের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যেটি আল্লাহর দেয়া গুণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এটি কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কারও থাকে না। শুধু প্রয়োজন পূরণ নয় বরং মাখলুকের সমস্ত গুণই এরকম আল্লাহর দেয়া। যেমন, ইলম, কুদরত, বদান্যতা, সাহায্য - সহযোগিতা, এমনকি সৃষ্টির নিজের অস্তিত্ত্বও আল্লাহ প্রদত্ত” 

(ফতোয়ায়ে রিদাভিয়্যা, খ: ৭, পৃ: ৬৩৭-৬৩৯)

 

 

 

 

 

 

 

 


 

এখানে আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী কয়েকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, 

 

১। আব্দুল কাদের জিলানী বা অন্য কাউকে যখন প্রয়োজন পূরণকারী বলা হবে কিংবা তাদের দিকে কোন প্রয়োজন পূরণের বিষয় সম্পৃক্ত হবে, এর দ্বারা মূল উদ্দেশ্য হবে মূলত: আল্লাহ তায়ালাই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন পূরণ করেন। সৃষ্টি তথা ব্যক্তি বা বস্তু এখানে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। মূল বিষয় আল্লাহর দিকেই ন্যাস্ত হবে।

২। মাখলুকের কোন কিছুই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বরং প্রয়োজন পূরণ থেকে শুরু করে তার ইলম, ক্ষমতা, বদান্যতা এমনকি তার নিজেরও অস্তিত্বও আল্লাহর দেয়া। এখানে মাখলুকের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিজস্ব বলে কিছু নেই। 

 

৩। আব্দুল কাদের জিলানীর নাম নেয়ার কথা বললেও মূল প্রয়োজন পূরণ করবেন আল্লাহ তায়ালা। যা খোদ আব্দুল কাদের জিলানী নিজে বলেছেন এবং এটাকেই আহমদ রিদ্বা খান তার মূল সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমরা উপরে দেখিয়েছি, এই পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণের ক্ষেত্রেও আহমদ রিদ্বা খান চূড়ান্ত প্রয়োজন পূরণকারী হিসেবে আল্লাহ তায়ালাকেই সাব্যস্ত করেছেন এবং আল্লাহর কাছে দু’য়া করার বিভিন্ন পদ্ধতি ও নিয়ম শিখিয়েছেন। এবং এও শর্ত করে দিয়েছেন যে, আদব ও ইহতিরামের সাথে, তাড়াহুড়ো না করে, গোনাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করে এভাবে দু’য়া করলে সেটি কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখানে যাদের ওসিলা করা হচ্ছে কিংবা যাদেরকে সুপারিশকারী মনে করা হচ্ছে, তাদের কাউকেই সুপারিশের ক্ষেত্রেও স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ  মনে করা হচ্ছে না যে, আল্লাহ তায়ালা চান অথবা না চান, নাউজুবিল্লাহ আব্দুল কাদের জিলানীর কাছে চাইলেই সেটা পূরণ হবে। এধরণের শিরকী সুপারিশ বা ওসিলাও এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নামাজ, দু’য়া, ইস্তিগাছা, দুরুদ ও সালাম সব কিছুর পরে প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি বান্দার দু’য়া কবুলও করতে পারেন। নাও করতে পারেন। তবে সঠিক পদ্ধতিতে করলে আদব ও ইহতিরামের সাথে করলে দু’য়া কবুলের সম্ভাবনা থাকে। 

 

৪। আহমদ রিদ্বা খান যেসব বিখ্যাত ইমামদের উদ্ধৃতিতে এটি তার কিতাবে এনেছেন সেটি গোপন করে পুরো বিষয়ের দোষটি শুধু আহমদ রিদ্বা খানের উপর চাপিয়ে তাকে `সুস্পষ্ট শিরকের` অভিযোগে অভিযুক্ত করা আরেকটি বড় ধরণের ইলমী খিয়ানত। উপরের পদ্ধতি ও আমল যদি শিরক হয়, তাহলে পূর্বের যেসব আলিমরা বিষয়টির উপর আমল করেছেন কিংবা আমলের জন্য তাদের কিতাবে এনেছেন, তাদেরকেও সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ দিতে হবে। এখানে শুধু আহমদ রিদ্বা খানের উপর কেন তার মাসলাকবাজির আশ্রয় নিয়ে অন্তরের সুপ্ত জিঘাংসা চরিতার্থ করা হবে? মিজান হারুনের উচিৎ ছিলো, মোল্লা আলী ক্বারীর উপর সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ দেয়া। শায়খ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভীর উপর শিরকের অভিযোগ দেয়া। ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আসআদ ইয়াফেয়ীর উপর শিরকের অভিযোগ দেয়া।  কিন্তু আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তিনি শিরকের অভিযোগের তীর শুধু আহমদ রিদ্বা খানের দিকে ছুঁড়েছেন। অথচ মূল বিষয় যদি শিরক হয়ে থাকে, তাহলে উপরের সবার দিকেই এই অভিযোগ আরোপ করার প্রয়োজন ছিলো। 

 

মাওলানা মিজান হারুন কীসের ভিত্তিতে আহমদ রিদ্বা খানের উপরের আলোচনাগুলিকে শিরক বানিয়ে দিলেন, তার কোন সুনির্দিষ্ট ভিত্তি আলোচনা করেননি। আব্দুল কাদের জিলানীকে উভয় জাহানের প্রয়োজন পূরণকারী কিংবা মুক্তিদাতা ইত্যাদি শব্দের বাহ্যিক অর্থ নিয়ে এটিকে আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে সুস্পষ্ট শিরকের অভিযোগ এনেছেন। অথচ খোদ আব্দুল কাদের জিলানী এবং আহমদ রিদ্বা খানের উভয়ে তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, তাদের প্রয়োজন পূরণ কিংবা বিপদাপদ দূর করার বিষয়টি মৌলিকভাবে আল্লাহর দিকেই ন্যাস্ত। মূলত: আল্লাহ তায়ালাই প্রয়োজন পূরণ কিংবা বিপদাপদ দূর করেন। এজন্য এখানে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কাউকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন পূরণকারী বিশ্বাস করা হচ্ছে না কিংবা কারও জন্য আল্লাহর ইচ্ছা, অনুমতি কিংবা আল্লাহর দেয়া ক্ষমতার বাইরে কোন কিছুই সাব্যস্ত করা হচ্ছে না, তাহলে কীসের ভিত্তিতে বিষয়টি শিরক হলো? 

 

এখানে মাওলানা মিজান হারুনের আরেকটি বড় ইলমী দুর্বলতা হলো, শিরকের মূলনীতি ও ভিত্তি আলোচনা না করে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর বড় শিরকের অভিযোগ তোলা। বিশেষ করে কারও ব্যাপারে শিরকের অভিযোগ সঠিক হওয়ার জন্য সবার আগে প্রয়োজন ছিলো, তার শিরক হওয়া বা না হওয়ার মূলনীতি ঠিক করে দেয়া। কিন্তু তিনি সেটি না করে জোরপূর্বক ব্যক্তির উপর শিরক চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি আশা করেছেন, পাঠক তার বক্তব্যের ফাঁক-ফোকর অনুধাবন না করেই তার শিরকের অভিযোগ মেনে নিবে। অথচ বাস্তবতা হলো কিছু মূর্খ মানুষকে এভাবে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হলেও বাস্তবে এভাবে কাউকে জোর করে বড় শিরকের অভিযোগ করে পার পাওয়া যাবে না। বরং তাকে এই মারাত্মক অভিযোগের দায় নিতে হবে। এবং শিরক হওয়া বা না হওয়ার দলিল ভিত্তিক আলোচনা করে মূলনীতি ঠিক করে তবেই শিরকের অভিযোগ দিতে হবে। 

 

নতুবা আমরা তো নজদী-তাইমীদেরকে কথায় কথায় মানুষকে শিরকের অভিযোগ দিতে দেখি। তাহাজ্জুদ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকা, স্ত্রীর ভালোবাসায় শরীয়াত বিরোধী কাজ করা, বাকীটা আল্লাহর হাতে বলা, এজাতীয় শত শত বিষয়কে শিরক বানিয়ে রেখেছে তারা। এমনকি এক সময় আমরা তাদের কাছ থেকে শুনেছি, মাওলানা বলা শিরক। কারণ, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজের ক্ষেত্রে মাওলানা শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য মাওলানা বলা শিরক। মাজহাব মানা শিরক। এভাবে তাদের শিরকের ফিরিস্তির তো কোন কুল-কিনারা নেই। 

 

মজার বিষয় হলো, এই আলোচনায় আহমদ রিদ্বা খান প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাজিউল হাজাত বলেছেন। একইভাবে আব্দুল কাদের জিলানীকেও কাজিউল হাজত বা প্রয়োজনপূরণকারী বলেছেন। মিজান হারুন সাহেব, এই দু’টি শব্দ নিয়েও শিরক হওয়ার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেই অর্থে কাজিউল হাজত বলা হয়েছে সেই অর্থে আব্দুল কাদের জিলানীকে কখনও কাজিউল হাজাত বলা হয়নি এটা নিশ্চিৎ। আবার মাখলুক হিসেবে নবীজী বা আব্দুল কাদের জিলানীকে যেই অর্থে কাজিউল হাজাত বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালাকে কখনও সেই একই অর্থে বলা হয় না। কিন্তু এখানে মিজান হারুন সাহেবরা আল্লাহ তায়ালাকে মাওলানা বলা আর হুজুরকে মাওলানা বলার বাহ্যিক শব্দকে এক করে শিরক বলার মতো করে তিনটি ব্যবহারকে এক বানিয়ে এর উপর জোর করে শিরকের হুকুম চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। 

 

শুধু শব্দের ব্যবহার যদি শিরক হওয়া বা না হওয়ার নির্ধারক হয়, তাহলে নাউজুবিল্লাহ পবিত্র কুরআনের নিচের সবগুলো ব্যবহারকে শিরক বলতে হবে। 

 

১। দেখুন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহর গুণ হিসেবে রহীম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বিসমিল্লাহ এর মধ্যেই রহীম গুণটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা ফাতিহার আর-রহমানির রহীম, এখানে রহীম শব্দটি আল্লাহর জন্য গুণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

আবার পবিত্র কুরআনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও রহীম বলা হয়েছে। যেমন সূরা তাওবার ১২৮ নং আয়াত,

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ (128)

এখানে আসলে শুধু রহীম নয়, রউফুন আল্লাহর গুণবাচক নাম। সেটিও নবীজীর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আজীজ আল্লাহর নাম। সেটিও নবীজীর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে এমন তিনটি গুণবাচক শব্দ এখানে নবীজীর জন্যও হুবহু একই শব্দে ব্যবহার করা হয়েছে।

তাহলে কী কুরআন আমাদেরকে নাউজুবিল্লাহ শিরক শিক্ষা দিচ্ছে?

২। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর গুণ হিসেবে সামী (শ্রোতা), বাসীর (দ্রষ্টা) শব্দ দু'টি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ একই গুণ মানুষের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন সূরা দাহরে রয়েছে,

هَلْ أَتَى عَلَى الإنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا ۝ إِنَّا خَلَقْنَا الإنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا ۝

অর্থ: মানুষের উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।

এখানে আল্লাহর জন্য ব্যবহার হওয়া 'সামী', 'বাসীর' গুণবাচক শব্দ দু'টি হুবহু বান্দা বা মানুষের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে কি নাউজুবিল্লাহ কুরআনে আল্লাহ ও বান্দার গুণের মাঝে শিরক করা হয়েছে?

৩। আল্লাহর আরেকটি গুণবাচক নাম হলো 'আলীম'। অথচ এটি হুবহু একই শব্দে পবিত্র কুরআনে বান্দার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন، সূরা যারিয়াতে হযরত ইব্রামী আ: এর স্ত্রীকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে একজন আলীম ছেলের।

فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۖ قَالُوا لَا تَخَفْ ۖ وَبَشَّرُوهُ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ

অর্থ: অতঃপর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হলঃ তারা বললঃ ভীত হবেন না। তারা তাঁকে একট জ্ঞানীগুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।

এখানে কি তাহলে আল্লাহর গুণবাচক নাম আলীম বান্দার জন্য ব্যবহার করে শিরক হয়েছে নাউজুবিল্লাহ?

কুরআনের অন্য জায়গায় আছে,

وفوق كل ذي علم عليم

এরকম হালীম আল্লাহর গুণবাচক নাম। আবার ইসমাইল আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও হালীম বলা হয়েছে। যেমন,

فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ

এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে, যেখানে আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো হুবহু বান্দার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কী শিরক হয়েছে? যদি শিরক না হয়ে থাকে, তাহলে কেন শিরক নয়? আপনি যে বললেন, আল্লাহর গুণ অন্যের জন্য সাব্যস্ত করা শিরক, তাহলে এসব ক্ষেত্রে শিরক নয় কেন? আর গুণের ক্ষেত্রে শিরক হওয়া বা না হওয়ার পার্থক্যই বা কীভাবে করা হবে?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কারণ, তারা শিরক বিষয়ে অনেক শোরগোল করলেও শিরকের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে অন্য সবার থেকে পিছিয়ে।

 

গুণের ক্ষেত্রে শিরকের বিষয়টি নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার পর যদি কর্মের ক্ষেত্রে শিরক নিয়ে আলোচনা তুলি, তাহলে এখানেও কুল-কিনারা করতে পারেন না। কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলো বলতে না পারলেও শিরক নিয়ে তাদের শোরগোল কিন্তু থেমে নেই।

যদি জিজ্ঞেস করি, আপনি যে বলেছেন, গুণ, কর্ম ও ইবাদতে আল্লাহর শরীক করা। গুণের বিষয় তো সুরাহা করতে পারলেন না। তো এবার কর্মের বিষয়ে বলেন। কর্মে আল্লাহর সাথে শরীক করার অর্থ কী?

বলে, আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কাজ বান্দার জন্য সাব্যস্ত করা হলো কর্মের শিরক।

জিজ্ঞেস করি, এরকম দু'একটি শিরকের উদাহরণ দিন।

বলে, সন্তান দেয়া, সৃষ্টি করা, জীবন - মৃত্যু দেয়া ইত্যাদি।

আমি বললাম, উপরের সবগুলো বিষয়ই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া মাখলুকের জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিছু উদারহণ দিলেই স্পষ্ট হবে। আল্লাহ তায়ালার কর্ম অন্যের জন্য সাব্যস্ত করে কি তাহলে কুরআনে নাউজুবিল্লাহ আমাদেরকে শিরক শেখান হয়েছে?

আপনাদের উদারহণ দেয়া কর্মগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রে ব্যবহারের কিছু নমুনা

১। হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম এর ঘটনা পবিত্র কুরআনের সূরা মারইয়ামে এসেছে।

فَاتَّخَذَتْ مِن دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا

অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পুর্ণ মানবাকৃতিতে আত্নপ্রকাশ করল।

قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَـٰنِ مِنكَ إِن كُنتَ تَقِيًّا

মারইয়াম বললঃ আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহভীরু হও।

قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا

সে বললঃ আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব।

এখানে সন্তান দেয়ার ক্ষেত্রে জিবরীল আলাইহিস সালাম নিজের দিকে সন্তান দেয়ার কর্মকে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আপনাকে পবিত্র সন্তান দিব। সন্তান দেয়ার কর্মকে সরাসরি নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন।

আল্লাহর কর্ম জিবরাইল আলাইহিস সালাম নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে কি কর্মের মাঝে শিরক করেছেন? যদি বলেন, হ্যাঁ। তাহলে কুরআন নাউজুবিল্লাহ শিরক শিক্ষা দিয়েছে। আর যদি না বলেন, তাহলে কর্মের মধ্যে শিরক হচ্ছে কি না সেটা কীভাবে পার্থক্য করা হবে? কোন কর্মটা শিরক আর কোনটা শিরক নয় সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?

২। আপনি উপরে সৃষ্টির কথা বলেছেন। অথচ সৃষ্টি করার কথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যেও পবিত্র কুরআনে ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আপনার উদাহরণ দেয়া অনেকগুলো কর্মের ক্ষেত্রে ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, আমি এগুলো আল্লাহর অনুমতিতে করি। যেমন, সূরা আল-ইমরানের ৪৯ নং আয়াতে রয়েছে,

وَرَسُولًا إِلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُم مِّنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَىٰ بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ وَأُنَبِّئُكُم بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

আর বণী ইসরাঈলদের জন্যে রসূল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছি নিদর্শনসমূহ নিয়ে। আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখীর আকৃতি তৈরী করে দেই। তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি, তখন তা উড়ন্ত পাখীতে পরিণত হয়ে যায় আল্লাহর হুকুমে। আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে। আর আমি জীবিত করে দেই মৃতকে আল্লাহর হুকুমে। আর আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আস এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আস। এতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।

এখানে ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি সৃষ্টি করে সেখানে ফুৎকার দেই। আর সেটি আল্লাহর অনুমতিতে পাখি হয়ে যায়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি এখানে খালক বা সৃষ্টি শব্দ ব্যবহার করেছেন। একইভাবে মৃতকে জীবিত করার কথাও বলেছেন। একইভাবে তিনি গায়েবের বিষয়ও বলতে পারেন। যেমন, তোমরা কী খাও, আর ঘরে কী সঞ্চয় করো, সেগুলোও আমি আল্লাহর অনুমতিতে বলে দিতে পারি।

এখন মৌলিকভাবে এসব কর্ম আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়, তাহলে ঈসা আলাইহিস সালাম বা অন্য কারও দ্বারা সেগুলো সংগঠিত হওয়া শিরক। আপনি হযত বলবেন, এগুলো তো তিনি আল্লাহর অনুমতিতে করেছেন। তখন প্রশ্ন থাকে, আল্লাহ তায়ালা কি ঈসা আলাইহিস সালাম বা অন্য কাউকে শিরক করার অনুমতি কখনও দিবেন? মৌলিকভাবে বিষয়গুলো যদি শিরকই হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা কী শিরক করার অনুমতি দেন? আর যদি মৌলিকভাবে কর্মগুলো যদি শিরক না হয়, তাহলে আপনি উপরে এগুলোকে কর্মের শিরক কেন বললেন? আর কর্মের ক্ষেত্রে শিরক হচ্ছে কি না সেটা বোঝার মানদন্ডই বা কি?

৩। উপরে ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর অনুমতিতে মৃতকে জীবিত করার কথা বলেছেন। এর উল্টোও কুরআনে আছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যান্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।

এই আয়াতসহ কুরআনের বহু আয়াতে জান-কবজ ও মৃত্যুকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

আবার একই কাজ (জান-কবজ) বা মৃত্যুকে আল্লাহ ছাড়া অন্য মাখলুকের দিকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ

বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।

সূরা সাজদাহ, আয়াত-১১।

এখানে জান-কবজের কাজকে ফেরেশতাদের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এখন আল্লাহর কর্মকে ফেরেশতাদের দিকে সম্পৃক্ত করাতে কি কর্মের শিরক হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে কর্মের শিরক জিনিসটা কী? আপনার উপরের বক্তব্য অনুযায়ী এগুলো কর্মের শিরক হওয়ার কথা?

আপনি হয়ত বলবেন, ঈসা আলাইহিস সালাম বা ফেরেশতাদের কর্মগুলো রুপক। এখন প্রশ্ন আসবে, রুপক অর্থেও কি আল্লাহর সাথে শিরক করার অনুমতি আছে? এখানে রুপক বলতে কী উদ্দেশ্য? আপনার বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছু কর্ম রয়েছে যেগুলো আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। সেগুলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও থেকে প্রকাশিত হলে আপনি এটাকে কর্মের শিরক মনে করছেন। অথচ আমরা দেখছি, এই কাজগুলো পবিত্র কুরআনেই বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ ছাড়া অন্য থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা আছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, নাউজুবিল্লাহ পবিত্র কুরআন আমাদেরকে কর্মের শিরক শিক্ষা দিয়েছে। আর যদি বিষয়টি এমন না হয়, তাহলে কর্মের শিরকের বাস্তবতা তাহলে কী? কীভাবে পার্থক্য করা হবে যে, কোন কর্মটা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করলে তাওহীদ, আর কোনটা আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টির দিকে সম্পৃক্ত করলে শিরক?

উভয়ের মাঝে পার্থক্যের মানদন্ডটা আসলে কী?

 

শিরকের মানদন্ড আলোচনার পূর্বে সালাতুল গাউসিয়া  বা এজাতীয় কাছাকাছি আমল কারা করেছেন, তাদের বিষয়ে কিছু আলোচনা প্রয়োজন। এখানে মোল্লা আলী ক্বারী সহ অন্যদের কিছু আলোচনা তাদের কিতাব থেকে উদ্ধৃত করার চেষ্টা করব। 

 

১। হানাফী মাজহাবের বিখ্যাত আলিম মোল্লা আলী ক্বারী শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর জীবনীর উপর পৃথক একটি পুস্তক রচনা করেছেন। এর নাম দিয়েছেন, নুজহাতুল খাতিরিল ফাতির ফি তারজামাতি সাইয়্যিদিশ শরীফ আব্দিল ক্বাদির। এই কিতাবের ৬১ পৃষ্ঠায় তিনি সনদসহ সালাতুল গাউসিয়ার বিষয়টি আব্দুল কাদের জিলানী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, 

“ শায়খ আবুল হাসান আলী আল-খাব্বাজ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শায়খ আবুল কাসেম উমর আল-বাজ্জাজকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি সাইয়্যিদি মহিউদ্দীন আব্দুল কাদেরকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন বিপদাপদে আমার মাধ্যমে সাহায্য চাইবে তার বিপদ দূর করা হবে, কোন মুসীবতে কেউ আমার নামে ডাকলে তার মুসীবতের সমাধান করা হবে। যে আমার ওসিলা করে কোন প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে তার প্রয়োজন পূরণ করা হবে। যে ব্যক্তি দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর এগারবার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, নামাজ শেষে নবীজীর উপর এগার বার দুরুদ-সালাম পেশ করবে এবং আল্লাহর রাসূলের কথা স্মরণ করবে, অত:পর ইরাকের দিকে এগার কদম অগ্রসর হবে এবং আমার নাম স্মরণ করে তার প্রয়োজনের কথা স্মরণ করবে, আল্লাহর অনুমতিতে তার প্রয়োজন পূরণ করা হবে।”

 

এই বর্ণনা উল্লেখ করে মোল্লা আলী ক্বারী লিখেছেন, এই আমলটি বহুবার পরীক্ষিত হয়েছে এবং বাস্তবে ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা শায়খ আব্দুল কাদিরের উপর সন্তুষ্ট হোন (নুজহাতুল খাতিরিল ফাতির, পৃ: ৬১)

 

এখানে মোল্লা আলী ক্বারী শুধু বর্ণনা উল্লেখ করেই ক্ষ্যান্ত হোননি, বরং এই আমলটি যে বহুবার আমল করে পরীক্ষিত বাস্তব একটি আমল সেটিও উল্লেখ করেছেন। সুতরাং মোল্লা আলী কারীর কাছে আমলটি শুধু বিশ্বাসের স্তরে থাকেনি, এটি বাস্তবে আমল করার মাধ্যমেও প্রমাণিত। এখন উপরের আমলের উপর যদি শিরকের হুকুম দিতে হয়, তাহলে কিতাবে উল্লেখ এবং আমলটিকে বার বার পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক প্রমাণের দাবীর কারণে মোল্লা আলী কারীর উপরও শিরকের অভিযোগ আসবে। 





 









 


 

২। আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী

 

শায়খ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভীও তার আখবারুল আখইয়ার এবং যুবদাতুল আসার কিতাবে উপর্যুক্ত পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। 


 


 



 

৩। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী

উপরে আমরা দেখেছি, মাওলানা মিজান হারুন আব্দুল কাদির জিলানীকে গাউসুস সাকালাইন  বা জ্বিন ও ইনসানের মুক্তিদাতা বলার কারণে শক্ত সমালোচনা করে লিখেছেন, 

 

“ইন্নালিল্লাহ! জীলানী জ্বিন ও ইনসানের মুক্তিদাতা। প্রয়োজনপূর্ণকারী। তাহলে আল্লাহর জন্য তারা কী বাকি রেখেছে? আল্লাহ বলেছেন, ‌'তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো‌' [মুমিন: ৬০] আর তারা শেখাচ্ছে আব্দুল কাদের জীলানীকে ডাকতে। এগুলো সুস্পষ্ট শিরক। অপব্যাখ্যাকারীদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দিন।”

 

অথচ আমরা যদি শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর কিতাব দেখি, সেখানে তিনিও স্পষ্ট ভাষায় আব্দুল কাদের জ্বিলানীকে গাউসুস সাকালাইন বলেছেন। শায়খ উবাইদুল্লাহ আহরারকে ‘গাউসে আ’জম’ বলেছেন। এখন ওলী-বুজুর্গদের কাউকে গাউসুস সাকালাইন বলার দ্বারা যদি তাদেরকে আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে সুস্পস্ট শিরকের অভিযোগ দেয়া যায় তাহলে শাহ ওয়ালিউল্লাহর উপর কেন একই অভিযোগ আরোপ করা হবে না, যেই অভিযোগ আহমদ রিদ্বা খানের উপর আরোপ করা হচ্ছে? 

 

 

 

 


 


 


 

শিরকের অভিযোগের উপর আহমদ রিদ্বা খানের কৈফিয়ত:


 

এধরণের বিষয়ের উপর শিরকের অভিযোগ অনেক আগে থেকেই চলমান আছে। বিশেষ করে ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নজদীর খারেজী আন্দোলনের পর থেকে এর প্রচার-প্রসার বেশি হচ্ছে। এধরণের শিরকের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে আহমদ রিদ্বা খান বেরলভী তার “হায়াতুল মাওয়াত ফি বায়ানি সিমাইল আমওয়াত” কিতাবে লিখেছেন, 

 

“শাহ ওয়ালিউল্লাহ তার কিতাব আল-ইন্তিবাহ তে লিখেছেন, আমাকে আমার শায়খ আবু তাহের কুর্দি এই সিলসিলার খিরকা পরিয়েছেন। তিনি আমাকে ‘জাওয়াহিরে খামসা’ - তে যত আমল আছে সেগুলোর ইজাজত দিয়েছেন। 

 

পরবর্তীতে লিখেছেন,

“ আমি হজ্বের সফরে যখন লাহোর পৌঁছলাম, সেখানে শায়েখ মুহাম্মাদ সাইদ লাহোরীর হস্ত চুম্বনের সুযোগ হয়। তিনি আমাকে ‘সাইফী’ দু’য়ার ইজাজত দিয়েছেন। বরং তিনি জাওয়াহিরে খামসার সমস্ত আমলের ইজাজত দিয়েছেন।”

 

এই শাইখ আবু তাহের কুরদী মাদানী মূলত: শাহ ওয়ালিউল্লাহর হাদীস ও তাসাউফের সিলসিলায় রয়েছেন। মদিনায় দীর্ঘ সময় তার খেদমতে থেকে তার কাছ থেকে হাদীসের সনদ হাসিল করেছেন। এই সনদই পরবর্তীতে শাহ আব্দুল আজিজের মাধ্যমে শাহ ইসহাক পেয়েছেন। 

দু’য়ায়ে সাইফীর অনুমতি যেই শায়েখ সাইদ লাহোরীর কাছ থেকে নিয়েছেন তার সম্পর্কে শাহ ওয়ালিল্লাহ লিখেছেন, 

“ শায়েখ সাইদ ত্বরিকতের বরেণ্য শায়খদের মধ্যে বিশ্বস্ত একজন শায়েখ”। 

 

এই ইন্তিবাহ কিতাবেই জাওয়াহিরে খামসা ও সাইফী দু’য়ার সনদ উল্লেখ করা হয়েছে। এই সনদে শায়েখ আবু তাহের কুর্দির পিতা শায়েখ ইব্রাহীম কুর্দি, তার উস্তায শায়েখ আহমদ কাশশাশী, তার উস্তায শায়েখ আহমদ শাননাবী রয়েছেন। আরেক সনদে শাহ ওয়ালিউল্লাহর দাদা উস্তায় আহমদ নাখলী রয়েছেন।  মোটকথা এই চারজন শাহ ওয়ালিউল্লাহর অধিকাংশ হাদীসের সনদেও রয়েছে। তার মুসালসাল হাদীসের সনদগুলো বিশ্লেষণ করলে এমনটাই প্রতিয়মান হয়। 

অন্য দিকে শাইখ সাইদ লাহোরীর পীর ছিলেন শাইখ আশরাফ লাহোরী, তার শায়েখ ও পীর ছিলেন মাওলানা আব্দুল মালেক, তার শায়েখ ও পীর ছিলেন শায়েখ বাইজীদে সানী (দ্বিতীয় বায়জীদ), এবং শায়েখ আহমদ শান্নাবীর পীর ছিলেন সাইয়্যেদ সিবগাতুল্লাহ বুরুজী। তাদের পীর ছিলেন মাওলানা ওজীহুদ্দীন আলাভী। এই সমস্ত মাশায়েখ ও উলামা সাইফী দু’য়া সহ জাওয়াহিরে খামসার বিভিন্ন আমলের ইজাজত তাদের উস্তায থেকে হাসিল করেছেন এবং তারা তাদের ছাত্রদেরকে ইজাজত দিয়েছেন। শাহ মুহাম্মাদ গাউস গোলিয়ারী তো এই সিলসিলার সর্বশেষ ব্যক্তি। তিনি নিজেই জাহওয়াহিরে খামসার লেখক। আল্লাহ তায়ালা সবার উপর রহম করুন।

 

লক্ষ্য করুন, এই জাওয়াহিরে খামসাতে সাইফী দু’য়ার পদ্ধতি এভাবে লেখা হয়েছে,

“সাতবার, তিনবার অথবা একবার নাদে আলী পড়বে। নাদে আলী হলো,

 

ناد عليا مظهر العجائب 

تجده عونا لك في النوائب

كل هم و غم سينجلي 

بولايتك يا علي يا علي

 

অর্থ: আশ্চর্য্য বিষয় প্রকাশের আধার আলীকে ডাকো। তোমার বিপদাপদে তাকে সাহায্যকারী হিসেবে পাবে। প্রত্যেক চিন্তা ও পেরেশানী অচিরেই দূর হবে। আপনার বিলায়াতের মাধ্যমে হে আলী, হে আলী। 

 

আলী রাজিয়াল্লাহু কে মুশকিল কুশা বা বিদাপদে সাহায্যকারী বিশ্বাস করা, মুসীবতে উদ্ধারকারী বিশ্বাস করা, চিন্তা - পেরেশানীর সময় ইয়া আলী ইয়া আলী বলে আহ্বান করা সরাসরি শিরক হয়, তাহলে তোমাদের নিকট উপরের সমস্ত আলিম ও মাশায়েখ কাফের ও মুশরিক হওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় মুশরিক ও কট্রর কাফের হওয়ার কথা নাউজুবিল্লাহ শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ। তিনি তো এসব মুশরিকদেরকে ওলী মনে করতেন, নিজের শায়েখ, উস্তায, পীর ও হাদীস ও তাসাউফের সনদ মনে করেন তাদেরকে। নবীজীর হাদীসের সনদ নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে। লম্বা সময় তাদের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাদের শায়খ, সিকাহ, আমানতদার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের সাক্ষাৎকে হস্ত চুম্মনের সৌভাগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।  

 

এই যে মুহাদ্দিস হওয়া, তাদের সব হাদীসের সনদ এমনভাবে ধ্বংস হলো যে এর মধ্যে এতোজন মুশরিক রয়েছে। শাহ ওয়ালীউল্লাহর পরে শাহ আব্দুল আজিজও একইভাবে পূর্ববর্তীদের প্রতি তার মহব্বত, সুধারণা, তাদের আক্বিদা ও চিন্তা-চেতনার সাথে একাত্মতা ছিলো। শাহ সাহেবের হাতে বাইয়াত, তার ছাত্রত্ব এবং তার হাদীসের সব সনদেও তোমাদের এই বড় মুশরিক ও বড় কাফির রয়েছেন। তাহলে কীসের মুহাদ্দিস হওয়া, কীসের রাজত্ব, মূল ঈমান ঠিক আছে কি না সেটা নিয়েই প্রশ্ন। ইন্নালিল্লাহি ওইন্না ইলাইহি রাজিউন। 

 

তাছাড়া পরবর্তীতে মৌলভী ইসহাক ও শাহ ইসমাইলের আর কী বিশেষত্ব বাকী রইল? তাদের সব কিছুই তো এই শিরকের জলাভূমিতে নিমজ্জিত। তাদের বংশ মুশরিকদের, তারা মুশরিকদের সন্তান, তাদের উস্তায মুশরিক, পীর মুশরিক। চোখ খুললেই তারা মুশরিক দেখতে পাবে। বুঝ হয়েছে মুশরিকদের মাঝে। মুশরিকদের কলে-পিঠে, মুশরিকদের লালন-পালনে, তাদের খোর-পোষে তারা বড় হয়েছে।  তাদের আমল - আখলাক মুশরিকদের কাছ থেকে এসেছে, তাদের বেড়ে ওঠা মুশরিকদের মাঝে, মুশরিকদের কাছ থেকে শিখেছে, মুশরিকদের কাছে পড়েছে, দাদা মুশরিক, নানা মুশরিক, সারা জীবন এই মুশরিকদেরকেই মেনে এসেছে। নাউজুবিল্লাহ। লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। 

 

প্রিয় মুসলিম, দেখুন,  ইয়া আলী ইত্যাদি নিদা করাকে শিরক বলার কতো বড় শাস্তি তাদের ভাগ্যে জুটেছে। তারা যদি অন্যায়ভাবে মুসলমানদেরকে মুশরিক বলার কাজে লিপ্ত না হতো তাহলে তাদের এরকম আগে-পরে সবার মুশরিক হওয়ার মুসীবতে পড়তে হতো না। এই মুসীবতে পড়ার চেয়ে তাদের জন্য উত্তম তো ছিলো তারা সঠিক পথে ফিরে আসত। প্রকৃত মুসলমানদেরকে মুশরিক বানান ছেড়ে দিন নতুবা নিজেদের লোকদের ঈমান আছে কি না সেই ফিকির করুন। 



 

 



 

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

ব্রেলভীদের খন্ডনে দেওবন্দীদের ইলমী খিয়ানত কেন?

Ijharul Islam · 09 মার্চ, 2026 · 68
ইতিহাস

আহমাদ রিদা খান ব্রেলভীর বিরুদ্ধে মিজান হারুনের অপপ্রচার ও মিথ্যাচার (২য় পর্ব)

Ijharul Islam · 17 মে, 2023 · 29
ইতিহাস

আহমাদ রিদা খান ব্রেলভীর বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দের অপপ্রচার (১ম পর্ব)

Ijharul Islam · 14 মে, 2023 · 38