আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর উপর ইবনে তাইমিয়ার অপবাদ ও মিথ্যাচার (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম বুধ, 09 নভে., 2022
28

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: ছিলেন শীর্ষস্থানীয় ফকীহ সাহাবী। সাহাবীগণের মধ্যে ফিকহ, ফতোয়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে চারজন সাহাবী ছিলেন আব্দুল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ। তাদের অন্যতম ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা:। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: বিভিন্ন ক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস থেকে বরকত হাসিলের চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে, নবীজী যেসব জায়গায় নামাজ আদায় করেছেন, সেসব জায়গা খুঁজে খুঁজে তিনি নামাজ আদায় করতেন। 

 

এ বিষয়ে মুয়াত্তায়ে মালিকে ইমাম মালিক রহ: বর্ণনা এনেছেন,

عن عبد الله بن عبد الله بن جابر بن عتيك، أنه قال: جاءنا عبد الله بن عمر في بني معاوية -وهي قرية من قرى الأنصار- فقال: هل تدرون أين صلى رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدكم هذا؟، فقلت له: نعم؛ وأشرت إلى ناحية منه، فقال لي: هل تدري ما الثلاث التي دعا بهن فيه؟، فقلت له: نعم، قال: فأخبرني بهن، قال: فقلت: دعا بأن لا يظهر عليهم عدوا من غيرهم، ولا يهلكهم بالسنين فأعطيهما، ودعا بأن لا يجعل بأسهم بينهم فمنعها، قال: صدقت. قال ابن عمر: فلن يزال الهرج إلى يوم القيامة

 

অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাবের বিন আতিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনু মুয়ায়িয়া গোত্রে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: আমাদের কাছে একবার আসলেন। এই গোত্রটি মূলত: আনসার সাহাবীদের একটি গ্রাম ছিলো। ইবনে উমর রা: এসে বললেন, তোমরা কি জানো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের এই মসজিদের কোথায় নামাজ আদায় করেছেন? আমি তাকে বললাম, হ্যাঁ। এরপর মসজিদের একটি কোনার দিকে ইঙ্গিত করলাম। 

[মুওয়াত্তায়ে মালিক, হা: ৫৭৫]






সহীহ বোখারীতেও এ সংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে। 

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্দিল বার (মৃত: ৪৬৩ হি:)  রহ: বলেন,

فيه ما كان عليه ابن عمر من التبرك بحركات رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم اقتداء به وتأسيا بحركاته؛ ألا ترى أنه إنما سألهم عن الموضع الذي صلى فيه رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدهم ليصلي فيه تبركا بذلك ورجاء الخير فيه

অর্থাৎ উপর্যুক্ত হাদীস থেকে এটিও প্রমাণিত হয় যে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: নবীজীর বিভিন্ন কাজ ও আমল থেকে বরকত হাসিল করতে চাইতেন। বিশেষ করে অধিক অনুসরণ - অনুকরণ, স্মরণ ইত্যাদির মাধ্যমে। তুমি কি দেখো না যে, তিনি উপরের হাদীসে নবীজী তাদের মসজিদের কোথায় নামাজ পড়েছেন, সেখানে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বরকত ও কল্যাণের আশা করে  এটি জিজ্ঞেস করেছেন?

 

[আত-তামহীদ, খ: ১৯, পৃ: ১৯৭ ]
 

 

মালেকী মাজহাবের আরেক ইমাম ইবনুল আরাবী আল-মালেকী (মৃত: ৫৪৩ হি:)  রহ: বলেন,

 

في هذا الحديث أن رسول الله صلى الله عليه [وآله] وسلم كان يأتي قرى الأنصار ويصلي في مساجدها ودورها، ليتبرك بالصلاة فيها بعده

 

অর্থাৎ এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার সাহাবীদের মসজিদ ও ঘরে এসে নামাজ আদায় করতেন যেন পরবর্তীতে তারা এটিকে বরকত হাসিলের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।[আল-মাসালিক ফি শরহি মুয়াত্তায়ে মালিক, খ:৩, পৃ:৪৭৯ ]

 


 

ইমাম জুরকানী (মৃত: ১১২২ হি:) উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,

 

هل تدرون أين صلى رسول الله، صلى الله عليه [وآله] وسلم من مسجدكم هذا؟”: لأصلي فيه وأتبرك به لأنه كان حريصا على اقتفاء آثاره

অর্থাৎ ইবনে উমর রা: তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, তোমরা কি জানো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের এই মজসিদের কোথায় নামাজ আদায় করেছেন? (এর দ্বারা তিনি মূলত: বলতে চেয়েছেন)  কারণ, আমি সেখানে নামাজ আদায় করতে চাই এবং এর মাধ্যমে বরকত হাসিল করতে চাই। কেননা, ইবনে উমর রা: নবীজীর রেখে যাওয়া বস্তু ও আমল থেকে বরকত হাসিলের ব্যাপারে উন্মুখ ছিলেন। 

 


 

ইবনে উমর রাজি: এর উপরের আমলকে ইবনে তাইমিয়া তার কিতাবে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। সেই সাথে মারাত্মক কিছু অপবাদ ও অভিযোগ জুড়ে দিয়েছেন এর উপর। ইবনে তাইমিয়া তার ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম কিতাবের ২ খন্ডে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন,

 

“নবীজী সাল্লাল্লাহু ঘটনাক্রমে যেসব জায়গায় নামাজ আদায় করেছেন, সেখানে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্য করাটা ইবনে উমর ছাড়া অন্য কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি। বরং হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী, সমস্ত আনসার ও মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে হজ্ব, উমরা বা সফরের জন্য মদিনায় যেতেন, তাদের কারও থেকে এটি বর্ণিত হয়নি যে, তারা নবীজীর নামাজের জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে নামজ আদায় করেছেন। আর এটা জানা কথা যে, এটি তাদের কাছে যদি মুস্তাহাব হতো, তাহলে তারা এবিষয়ে অগ্রগামী থাকতেন। কারণ, তারা নবীজীর সুন্নত সম্পর্কে বেশি জানতেন এবং অন্যদের চেয়ে তা অনুসরণে অগ্রগামী ছিলেন। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের উপর আমার সুন্নত ও আমার পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত অনুসরণ করা কর্তব্য। তোমরা এগুলো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে রাখো। সাবধান, নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক নব-সৃষ্ট বিষয়ই বিদয়াত। আর প্রত্যেক বিদয়াতই ভ্রষ্টতা। 

 

সুতরাং এভাবে নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে খুঁজে সেখানে নামাজ আদায় করা খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত নয়।  বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদয়াত। আর সাহাবীর বক্তব্য যখন অন্যদের বিপরীত হয়, তখন সেটি দলিল থাকে না। তাহলে সমস্ত সাহাবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই আমল কীভাবে দলিল হতে পারে? 

 

তাছাড়া এভাবে নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে খুঁজে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে এটিকে মজসিদ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। অথচ শরীয়াতে এজাতীয় বিষয়ে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এটি আল্লাহর সাথে শিরকের মাধ্যমও।……” 

 

 

ইবনে তাইমিয়ার উপরের বক্তব্য থেকে যেসব বিষয় সামনে আসছে,

 

১। ইবনে উমর রা: সেসব জায়গা খুঁজে খুঁজে নামাজ আদায় করতেন যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন। 

২। ইবনে উমর রা: ছাড়া অন্য কারও থেকে এসব জায়গায় নামাজ আদায়ের কথা বর্ণিত হয়নি। 

৩। ইবনে উমর রা: এর এই আমলটি ভ্রষ্টতাপূর্ণ বিদয়াত। আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, বরং এটি শিরকের মাধ্যম। 

 

ইবনে তাইমিয়ার উপরের বক্তব্যের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্ট। সেটি হলো, ইবনে তাইমিয়া যে মতটি গ্রহণ করেছে সেটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত এমনকি খোলাফায়ে - রাশেদীন, প্রথম সারির আনসার - মুহাজিরীন সকলের মত হিসেবে উপস্থাপন করা। এর বিপরীত মত অর্থাৎ হযরত ইবনে উমর রা: এর মতকে বিচ্ছিন্ন মত, অন্য সাহাবীদের বিপরীতে একক মত, বিদয়াত, শিরকের মাধ্যম ইত্যাদি আখ্যা দেয়া। এটি আসলে ইবনে তাইমিযার খুবই পুরাতন সমস্যা। এই সমস্যা বহু উলামায়ে কেরাম হাতে-নাতে দেখিয়েছেন। নিজের মতের পক্ষে তিনি সর্ব-সম্মত মত, ঐকমত্য, ইজমা ইত্যাদির মিথ্যা দাবী করে সাধারণ মানুষের সাথে ধোঁকাবাজী ও প্রতারণা করে থাকেন। যদিও বিষয়গুলো খুব স্পষ্ট বিষয় হোক। কিন্তু খুব সাধারণ ও স্পষ্ট বিষয়েও নিজের মতের পক্ষে ইবনে তাইমিয়া ইজমা বা সর্ব-সম্মত মতের দাবী করে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে থাকেন। এটি বলা যায়, তার একটি অভ্যাসগত বিষয়। তিনি যতো বিষয়ে এভাবে ইজমার দাবী করেছেন ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এর অধিকাংশই মিথ্যা। আল-ইয়াজু বিল্লাহ। 

 

নিজের মতের পক্ষে ইজমা বা ঐকমত্যের দাবী করে ইবনে তাইমিয়ার  এধরণের মিথ্যাচার ও প্রতারণা বহু উলামায়ে কেরামের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বিষয়। উদাহরণ হিসেবে আমি এখানে ইমাম ত্বকিউদ্দীন হুসোনী (752-829 হি:) রহ: এর কিছু আলোচনা উল্লেখ করছি। ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: তার দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার এধরণের অনেকগুলো মিথ্যাচার ও প্রতারণার উদাহরণ এনে উম্মতকে তার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এ কিতাবের ৯৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন,

 

“ইবনে তাইমিয়ার একটি পাপকাজ হলো, সে যা বলে এবং যার পক্ষে ফতোয়া দেয়, এর উপর ইজমার দাবী করে থাকে। যেমন মক্কা উত্তম নাকি মদীনা এই বিষয়ে সে তার নিজের মতের পক্ষে ইজমার দাবী করেছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে ওলামাদের মতবিরোধ খুবই প্রসিদ্ধ। এমনকি মানুষের কাছে সহজলভ্য কিতাব কাজী ইয়াদের শিফাতেও এই মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ইমাম মালিক রহ: ও অধিকাংশ মদিনাবাসীর মত হলো, মদিনা মক্কা থেকে উত্তম। মক্কাবাসী ও কুফাবাসীর মত হলো, মক্কা উত্তম।”

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ৯৪]



 

একই কিতাবের ১৪৭ পৃষ্ঠায় ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: লিখেছেন, 

“উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, ইবনে তাইমিয়া ইজমার দাবী করার ক্ষেত্রে মিথ্যাচার করে থাকে। যে তার এজাতীয় দাবীর অনুসন্ধান করবে সে তার এই মিথ্যাচার দেখতে পাবে। অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু সে অন্যের থেকে বর্ণনা করে যা নিরেট মিথ্যা। অন্যের কথা নকল করলেও সঠিকভাবে করে না। আর সঠিকভাবে বর্ণনা করলেও এমন কথা ঢুকিয়ে দেয় যা ঐ ব্যক্তির বক্তব্য নয়। বিষয়টি ভালোভাবে জেনে রেখো এবং তার তাকলীদ করার বিষয়ে সতর্ক থেকো। কারণ, এরকম তাকলীদ করলে সে যেমন ধ্বংস হয়েছে, তুমিও হবে।”

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ১৪৭ ]

 

একই কিতাবের ১৫১ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন,

“ ঐকমত্য ও ইজমার দাবীর ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার চেয়ে বড় মিথ্যুক ও এধরণের পাপকাজে অধিক দু:সাহসী আর কাউকে দেখিনি” 

[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ১৫১ ]

 


 

একই ধরণের কথা তিনি ১৫৫ ও ১৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। 

এখানে ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: এর বক্তব্য বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে এর চেয়ে ভয়াবহ। আসলে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যার বেসাতির কোন কুল-কিনারা নেই। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারীর ‘আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন’ দেখা যেতে পারে। যেখানে তিনি জায়গায় জায়গা ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যাচার ও প্রতারণা স্পষ্ট করেছেন। ইজ্জুদ্দিন বিন আব্দুস সালামের একটি বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলে এ কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি এর প্রতিবাদ করে লিখেছেন, 

“আমার মত হলো, ইবনে তাইমিয়ার এই ভুলটি অনিচ্ছাকৃত নয়। বরং এটি তার ইচ্ছাকৃত বিকৃতি”

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ৫৩]

 

এখানে ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: এর বক্তব্য বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে এর চেয়ে ভয়াবহ। আসলে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যার বেসাতির কোন কুল-কিনারা নেই। এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারীর ‘আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতীন’ দেখা যেতে পারে। যেখানে তিনি জায়গায় জায়গা ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় মিথ্যাচার ও প্রতারণা স্পষ্ট করেছেন। ইজ্জুদ্দিন বিন আব্দুস সালামের একটি বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া বিকৃতভাবে উপস্থাপন করলে এ কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি এর প্রতিবাদ করে লিখেছেন, 

“আমার মত হলো, ইবনে তাইমিয়ার এই ভুলটি অনিচ্ছাকৃত নয়। বরং এটি তার ইচ্ছাকৃত বিকৃতি”

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ৫৩]



 

একই কিতাবের ২১৯ পৃষ্ঠায় আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক আল-গুমারী রহ: বলেন,

 

“পূর্বের আলোচনায় ইজ্জুদ্দিন ইবনে আব্দিস সালামের বক্তব্যকে ইবনে তাইমিয়া যে ভুল করেছেন সেটি উল্লেখ করেছি। এটি সম্ভবত: তার ইচ্ছাকৃত ভুল। আমার কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, উলামাদের বক্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়া বিশ্বস্ত বা নিরাপদ নন”।

[আর-রদ্দুল মুহকামুল মাতিন, পৃ: ২১৯ ]

 


 

ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে একই কথা বলেছেন, বিখ্যাত ইমাম ত্বকিউদ্দীন সুবকী রহ:। তিনি তার ফতোয়ায় লিখেছেন,

وَهَذَا الرَّجُلُ [=ابن تيميّة] كُنْت رَدَدْتُ عَلَيْهِ فِي حَيَاتِهِ فِي إنْكَارِهِ السَّفَرَ لِزِيَارَةِ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ [وَآلِهِ] وَسَلَّمَ، وَفِي إنْكَارِهِ وُقُوعَ الطَّلَاقِ إذَا حُلِفَ بِهِ، ثُمَّ ظَهَرَ لِي مِنْ حَالِهِ مَا يَقْتَضِي أَنَّهُ لَيْسَ مِمَّنْ يُعْتَمَدُ عَلَيْهِ فِي نَقْلٍ يَنْفَرِدُ بِهِ لِمُسَارَعَتِهِ إلَى النَّقْلِ لِفَهْمِهِ...وَلَا فِي بَحْثٍ يُنْشِئُهُ لِخَلْطِهِ الْمَقْصُودَ بِغَيْرِهِ وَخُرُوجِهِ عَنْ الْحَدِّ جِدًّا

অর্থাৎ এই ব্যক্তিকে (ইবনে তাইমিয়া) তার জীবদ্দশায় নবীজীর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা হারাম বিষয়ক বক্তব্য ও তালাকের ব্যাপারে কসম খেলে সেটি সংগঠিত হওয়ার বিষয়ে তার খন্ডন করেছি। এরপর তার বিষয়ে আমার কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সে কোন বিষয় এককভাবে বর্ণনা করলে এর উপর নির্ভর করা যায় না। কারণ, অনেক কিছু সে নিজের বুঝ অনুযায়ী বর্ণনা করে। এছাড়া তার নিজের শুরু করা কোন মাসআলার উপরও নির্ভর করা যায় না। কারণ সে আলোচনার বিষয়বস্তু পাল্টে ফেলে এবং মূল বিষয়ের সীমা থেকে বহু দূরে চলে যায়। 

[ফতোয়াস সুবকী, খ: ২, পৃ: ২১০]
 

 

 

শায়খ সালামাহ কুদায়ী ইজামী রহ: বিখ্যাত আলিম ছিলেন। আল্লামা জাহেদ কাউসারী রহ: তার বিভিন্ন কিতাবের উপর প্রশংসাবাণী দিয়েছেন। তিনিও তার কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় নানা মিথ্যাচারের স্বরুপ স্পষ্ট করেছেন। তিনি তার ‘বারাহিনুল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ কিতাবে লিখেছেন, 

“এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নানা রকম চিন্তাগত বিচ্যূতি আছে যেগুলোতে তারা সমস্ত উম্মতের বিরোধিতা করে এবং সবাইকে পরিত্যাগ করে থাকে। মানুষকে তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যূত করতে এরা ধোঁকাবাজী ও প্রতারণায় উস্তায। সত্য ও সঠিক বিষয় জানার আগে কেউ যদি তাদের কিতাব পড়ার বিপদে নিপতিত হয়, সে তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত মূর্খতা ( জাহেলে মুরাক্কাব) শিখবে। কোন কোন আলিম তো বলেছেন, সাজান - গোছান মূর্খতা শিখবে। (অর্থাৎ মূর্খতাকে তারা সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে থাকে)। কারণ তাদের কারণে সে বাতিল জিনিসকে হক্ব মনে করা শুরু করবে। আর তাদের বিপরীত যারা আছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামা হলেও তাদেরকে বাতিল মনে করা শুরু করবে। সে বিশ্বাস করা শুরু করবে, প্রকৃত সুন্নতের উপর এবং কুরআন-সুন্নাহের একমাত্র সঠিক বুঝের উপর কেবল তাদের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই রয়েছে। অথচ বিষয়টি এমন হওয়া আল্লাহর চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওয়াদা করেছেন যে, তার উম্মত সকলে ভ্রষ্টতার উপর একমত হবে না। আর আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিশ্রুতিতে সদা সত্য। তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন, প্রত্যেক যুগে নবীজী ও তার প্রকৃত অনুসারী উলামাদেরকে সাহায্য করেছেন। নবীজী ও তার অনুসারী উলামাদের উপর শতকোটি দুরুদ ও সালাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “দ্বীনের এই ইলমকে প্রত্যেক পরবর্তী যুগের ন্যায়-পরায়ণ ব্যক্তিরা বহন করবে। সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল মতাদর্শীদের চিন্তা-চেতনা, অজ্ঞ-মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে তারা দ্বীনকে সংরক্ষণ করবে।”

 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আমি আপনার কাছে এই উপদেশমালা (দ্বীন ও কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, আমিই এর সংরক্ষণ করব।” আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এই দ্বীনের সংরক্ষণ হবে এর নীতিমালা ও বিধি-বিধান এতো অধিক সংখ্যক উলামাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হবে যে, যখনই কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী বের হবে বা উলামাদের জামায়াত থেকে কেউ বের হয়ে যাবে, কুরআন-সুন্নাহের ইলমে অভিজ্ঞ উলামা ও ফকীহদের কাছে তার এই বিচ্ছিন্নতা ও দলছুট হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী যতই নিজের এই বিচ্ছিন্ন চিন্তা-চেতনাকে সুন্নতের অনুসরণ ও কুরআন - হাদীস সংরক্ষণ ইত্যকার বড় বড় দাবীর মাধ্যমে ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক। সে নিজেকে কিংবা তার ব্যাপারে অজ্ঞ কেউ তাকে যতই বড় বড় উপাধি দিক যেমন, নিজেকে সালাফী দাবী করা কিংবা সালাফের অনুসারী ইত্যাদি দাবী করা। এজন্য মুজতাহিদ উলামাদের ইজমা শরীয়াতের খুবই শক্তিশালী একটি দলিল। তাদের ইজমা থেকে বের হয়ে যাওয়া ভ্রষ্টতা ও বিদয়াতের নিদর্শন। এজন্য তুমি দেখবে, এই নতুন নতুন বিদয়াত তৈরিতে দক্ষ এই বিদয়াতী (ইবনে তাইমিয়া), তার নিজের তৈরি বিদয়াতের বিরুদ্ধে উম্মতের ইজমাকে খুব জোর গলায় অস্বীকার করতে চায়। বরং মিথ্যা ও জালিয়াতির মাধ্যমে  তার নিজের মতের পক্ষে ইজমা বা ঐকমত্যের দাবী করে। যেমনটি তুমি তিন তালাক ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের উপরের আলোচনা থেকে ইবনুল কাইয়্যিম ও তার উস্তাযের কাজ থেকে দেখেছো।”
 


 


 





 

শায়খ নিদাল বিন ইব্রাহীম আলু রাশশী ইবনে তাইমিয়ার এই মিথ্যাচার ও প্রতারণার উপর লম্বা আলোচনা করেছেন তার রফউল গাশিয়াহ কিতাবে। আলোচনার শুরুতে তিনি বলেন,

 

“ আমি আগে যেমনটি বলেছি, ইবনে তাইমিয়া ইজমা ইত্যাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যাচার করে থাকে। যেই কথার কোন শরয়ী ভিত্তি নেই এমন কথাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নত, অধিকাংশ সালাফ, অধিকাংশ মুহাদ্দিসীনদের নামে চালিয়ে দেয়। এটা শুধু আকিদার ক্ষেত্রে করে এমন নয়, বরং শাখাগত মাসআলা-মাসাইল ও ইমামদের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই কাজ করে থাকে। একটি শাখাগত বিষয়ের উদাহরণ দেয়াই এখানে যথেষ্ট যার দ্বারা স্পষ্ট হবে যে, ইবনে তাইমিয়া কী পরিমাণ ভ্রষ্টতা, প্রবৃত্তিপূজা, নিজের মতকে বড় করে দেখান, নিজের আকিদার সমর্থনে মিথ্যা বলে হলেও সেটিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ের ছিলো।”

 


 

নিজের মতের পক্ষে ইজমার দাবী, সর্ব-সম্মত মত ইত্যাদি বলার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার চিরাচরিত মিথ্যাচার নিয়ে অন্য কোথাও বিস্তারিত লিখব ইনশা আল্লাহ। উপরের আলোচনা থেকে এতটুকু স্পষ্ট করা উদ্দেশ্য যে, ইবনে উমর রা: এর উপর ইবনে তাইমিয়া সেই একই রকমের মিথ্যাচার করে তার অবস্থানকে অন্যান্য সাহাবীদের বিরোধী একক মত, বিদয়াত ও শিরকের মাধ্যম বানাতে চেয়েছে। এটি মূলত: ইবনে তাইমিয়ার পুরাতন টেকনিক। অধিকাংশ বিষয়ে তিনি এই ধরণের মিথ্যাচার করে থাকেন। এবার চলুন, ইবনে তাইমিয়ার এই ধোঁকাবাজীর স্বরুপ বিশ্লেষণ করা যাক আরেকটু বিস্তারিতভাবে। 

 

নবীজীর সাথে সম্পর্কিত বস্তু বা আমলের মাধ্যমে বরকত হাসিলের প্রচেষ্টা যেমন যেখানে যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন সেখানে নামাজ আদায়ের চেষ্টাকে ইবনে তাইমিয়া উপরে বিদয়াত, আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য, শিরকের মাধ্যম ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছেন। অথচ পবিত্র কুরআনে সু্স্পষ্টভাবে মাকামে ইব্রাহীমে নামাজ আদায়ের আদেশ করা হয়েছে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, মাকামে ইব্রাহীম কী জিনিস? এর সহজ উত্তর হলো, যেই পাথরে দাঁড়িয়ে হযরত ইব্রাহীম আ: পবিত্র কা’বা নির্মাণ করেছিলেন সেটিই মাকামে ইব্রাহীম। ইব্রাহীম আ: এর এই স্মৃতির পাশে যদি নামাজ পড়ার বিধান সুস্পষ্টভাবে কুরআনে আসে এবং সেটি যদি শিরকের মাধ্যম না হয়, তাহলে নবীজীর নামাজের জায়গায় ইবনে উমর রা: এর আমল শিরকের মাধ্যম হবে কেন? যদি নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা থেকে বরকত হাসিল করা কিংবা সেটিকে উপলক্ষ্য বানিয়ে শরীয়াতের বৈধ আমলকে শিরকের মাধ্যম বলা হয়, তাহলে মাকামে ইব্রাহীমে নামাজ আদায় করা শিরকের মাধ্যম নয় কেন? ইবনে তাইমিয়ার কাছে কোন কিছুকে শিরক বা শিরকের মাধ্যম বলার মূলনীতিটা আসলে কী? নাকি ইয়াহুদী মুসা ইবনে মাইমুনের কাছ থেকে শিরক-তাওহীদের সবক নিয়ে সাহাবীদের আমলেও শিরক দেখা শুরু করেছিলেন? 

 

মজার ব্যাপার হলো, উপরে ইবনে উমর রা: এর আমলকে অন্য সাহাবীদের আমলের বিরোধী ও বিচ্ছিন্ন আমল সাব্যস্ত করার জন্য এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে যেন খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে সবাই এই আমলেের বিরোধী ছিলেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসুন বোখারী থেকে বিষয়টি বোঝা যাক। 

 

ইমাম বোখারী রহ: হযরত উমর রা: থেকে হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি বিষয় হযরত উমর রা: এর ইচ্ছার অনুরুপ অবতীর্ণ করেছেন। এ বিষয়ে নিচের হাদীসটি লক্ষণীয়,

 

حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عَوْنٍ، قَالَ حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ عُمَرُ وَافَقْتُ رَبِّي فِي ثَلاَثٍ، فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى فَنَزَلَتْ ‏(‏وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏)‏ وَآيَةُ الْحِجَابِ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَوْ أَمَرْتَ نِسَاءَكَ أَنْ يَحْتَجِبْنَ، فَإِنَّهُ يُكَلِّمُهُنَّ الْبَرُّ وَالْفَاجِرُ‏.‏ فَنَزَلَتْ آيَةُ الْحِجَابِ، وَاجْتَمَعَ نِسَاءُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم فِي الْغَيْرَةِ عَلَيْهِ فَقُلْتُ لَهُنَّ عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبَدِّلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ‏.‏ فَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ‏.‏

 

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাযি.) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর ওয়াহীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ ‘‘তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান বানাও’’- (সূরাহ্ আল-বাক্বারাহ ২/১২৫)। (দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আপনার সহধর্মিণীগণকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাঁদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়। আর একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে একত্রে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাঁদেরকে বললামঃ ‘‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের ত্বলাক (তালাক) দেন, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম অনুগত স্ত্রী দান করবেন’’- (সূরাহ্ তাহরীম ৬৬/৫)। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

 

বোখারী, হা: ৩০২

 

 

 

 

উপরের হাদীসে হযরত উমর রা: খুব স্পষ্টভাবে নবীজীর কাছে মাকামে ইব্রাহীমকে নামাজের জায়গা বানাবার জন্য আবেদন করেছেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়। নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত জিনিসকে কেন্দ্র করে নামাজ ইত্যাদির আমল যদি শিরকের মাধ্যম হতো, তাহলে উমর রা: এই ইচ্ছা ব্যক্ত করতেন না আর এ বিষয়ে কুরআনের আয়াতও নাজিল হতো না। 

 

দ্বিতীয়ত: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইবনে কাসীর বাইতুল মুকাদ্দাসের বিজয়ের ঘটনা বিস্তারিত লিখেছেন। সেখানে তিনি হযরত উমর রা: এর আমল তুলে ধরেছেন, 

 

قال الإمام أحمد: حدثنا أسود بن عامر، ثنا حماد بن سلمة عن أبي سنان، عن عبيد بن آدم، وأبي مريم، وأبي شعيب: أن عمر بن الخطاب كان بالجابية فذكر فتح بيت المقدس، قال: قال ابن سلمة: فحدثني أبو سنان، عن عبيد بن آدم سمعت عمر يقول لكعب: أين ترى أن أصلي؟

قال: إن أخذت عني صليت خلف الصخرة، وكانت القدس كلها بين يديك.

فقال عمر: ضاهيت اليهودية، لا ولكن أصلي حيث صلى رسول الله ﷺ، فتقدم إلى القبلة فصلى، ثم جاء فبسط ردائه وكنس الكناسة في ردائه، وكنس الناس.

وهذا إسناد جيد، اختاره الحافظ ضياء الدين المقدسي في كتابه (المستخرج)، وقد تكلمنا على رجاله في كتابنا الذي أفردناه في مسند عمر، ما رواه من الأحاديث المرفوعة، وما روى عنه من الآثار الموقوفة مبوبا على أبواب الفقه، ولله الحمد والمنة.

 

অর্থাৎ ইমাম আহমাদ রহ: বলেন, আমাদের কাছে আসওয়াদ বিন আমের বর্ণনা করেছেন, আমাদের কাছে হাম্মাদ বিন সালামা আবু সিনান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি উবাইদ বিন আদম, আবু মারইয়াম ও আবু শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমর রা: জাবিয়া নামক স্থানে ছিলেন। তখন তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের ঘটনা আলোচনা করলেন। তিনি বলেন, ইবনে সালামা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আবু সিনান উবাইদ বিন আদম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি উমর রা: কে কা’য়াব আল-আহবারকে বলতে শুনেছি যে, হে কা’য়াব, বাইতুল মুকাদ্দাসের কোথায় আমার নামাজ পড়াকে তুমি উত্তম মনে করো? তিনি বললেন, আপনি যদি আমার মত নিতে চান, তাহলে আমি হলে পাথরের পিছে নামাজ আদায় করতাম। সম্পূর্ণ বাতুল মুকাদ্দাসই তখন আপনার সামনে থাকবে। 

এই কথা শুনে হযরত উমর রা: বললেন, তুমি ইয়াহুদীবাদকে প্রাধান্য দিয়েছো। না। আমি বরং সেখানে নামাজ আদায় করব যেখানে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন। তখন তিনি কেবলার দিকে অগ্রসর হয়ে নামাজ আদায় করলেন। 

 

উক্ত হাদীস বর্ণনা উল্লেখ করে, ইবনে কাসীর বলেন, هذا إسناد جيد অর্থাৎ এটি একটি জাইয়্যেদ (ভালো) স্তরের সনদ। হাফেজ জিয়া আল-মাকেদসী তার আল-মুস্তাখরাজ কিতাবে এই মতটি গ্রহণ করেছেন। আমি এই হাদীসের রাবীদের ব্যাপারে আমার মুসনাদে উমর নামক স্বতন্ত্র কিতাবে আলোচনা করেছি। 

 

বর্তমানে শায়খ আলবানী বা শায়খ শুয়াইব আরনাউত উক্ত বর্ণনাকে দুর্বল বললেও শায়খ আহমাদ শাকের মুসনাদে আহমাদের উক্ত বর্ণনাকে হাসান বলেছেন। 


 

এছাড়া ইতবান বিন মালেক রা: এর বিখ্যাত হাদীস যা বোখারী - মুসলিমে রয়েছে এবং এ বিষয়ে খুবই স্পষ্ট হাদীস, সেটিও ইবনে তাইমিয়া খুব সহজেই এড়িয়ে গিয়ে পুরো বিষয়টাকে বিদয়াত বানাবার অপচেষ্টা করেছেন। হাদীসটি দেখে নেয়া যাক,

 

হযরত মাহমুদ ইবনে রবী আল-আনসারী বর্ণনা করেন,

أن عتبان بن مالك كان يؤم قومه وهو أعمى، وأنه قال لرسول الله صلى الله عليه وسلم: يا رسول الله إنها تكون الظلمة والسيل وأنا رجل ضرير، فصل يا رسول الله في بيتي مكانا أتخذه مصلى، فجاءه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: “أين تحب أن أصلي؟” فأشار إلى مكان من البيت، فصلى فيه رسول الله صلى الله عليه وسلم

অর্থ: হযরত ইতবান বিন মালিক রা. একজন অন্ধ সাহাবী ছিলেন। তিনি তার সম্প্রদায়ের ইমাম ছিলেন। তিনি রাসূল স. কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, অনেক সময় পথ অন্ধকার থাকে, বৃষ্টি হলে পানির প্রবাহ থাকে। আর আমি একজন অন্ধ। হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার ঘরের একটি জায়গায় নামায পড়ুন। এটাকে আমার নামাযের জায়গা বানাব। রাসূল স. তার বাড়ী আগমন করলেন এবং বললেন, আমি কোথায় নামায পড়লে তুমি খুশি হবে? তিনি ঘরের একটি জায়গা দেখালেন। রাসূল স. সেখানে নামায আদায় করলেন।[বোখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৩৬]

 

উক্ত হাদীসের মূল শব্দেই নবীজীর নামাজের জায়গাকে পরবর্তীতে নামাজের স্থান হিসেবে নির্ধারণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। নবীজী নিজেই সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন। এমনকি সেই সাহাবীর ঘরে গিয়ে বলেছেন, আমি কোথায় নামায পড়লে তুমি খুশি হবে। সাহাবী যেখানে স্পষ্ট শব্দে বলেছেন যে, হে আল্লাহর রাসূল, আমার ঘরের কোথাও আপনি নামাজ আদায় করুন, যেখানে আমি পরবর্তীতে নামাজ আদায় করব, এক্ষেত্রে নবীজী তাকে বলেননি, তুমি শিরকের দরজা খুলে দিচ্ছো। তোমার এই আবেদন বিদয়াত ও শিরক। তাহলে ইবনে তাইমিয়া এই শিরকের বুঝ কোথায় পেলেন? বিদয়াতের এমন ধারণা কোথায় পেলেন যেখানে খোদ ইবনে উমর রা: এর আমলকে বিদয়াত বানিয়ে দিচ্ছেন?

 

ইবনে তাইমিয়ার পূর্বে উক্ত হাদীসের উপর কাজী ইয়াদ, ইমাম নববী রহ: সহ অসংখ্য আলিম এধরণের বরকত হাসিলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কেউ বিষয়টিকে শিরক কিংবা বিদয়াত বলেননি। 

 

কাজী ইয়াদ রহ. বলেন,

فيه التبرك بالفضلاء، ومشاهد الأنبياء وأهل الخير ومواطئهم، ومواضع صلاتهم، وإجابة أهل الفضل لما رغب إليهم فيه من ذلك” এই হাদীস থেকে বুজুর্গদের থেকে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া নবী ও ওলীগণের  স্মরণীয় স্থান, তাদের হাটা-চলার জায়গা, তাদের নামাজের জায়গা থেকে বরকত হাসিল প্রমাণিত হয়। সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হয় যে, বুজুর্গদের থেকে এভাবে কেউ বরকত লাভ করতে চাইলে তার আবেদনে সাড়া দেয়া উচিৎ। “[ইকমালুল মু’লিম, কাজী ইয়াদ রহ. খ.২, পৃ.৩৫৩]

ইমাম নববী রহ. বলেন,

وفيه التبرك بالصالحين وآثارهم، والصلاة في المواضع التي صلوا بها، وطلب التبريك منه

অর্থ: এই হাদীস থেকে একটি শিক্ষণীয় বিষয় হল, নেককার বুজুর্গদের মাধ্যমে বরকত লাভ। এবং বুজুর্গরা যেখানে নামায আদায় করেছেন সেখানে নামায আদায় করে বরকত অর্জন করা। [শরহু সহীহি মুসলিম, খ.৫, পৃ.১৬১]

 

হাদীস থেকে শুধু নবীজীর নামাজের জায়গার মাধ্যমে বরকত হাসিলের বিষয়টি প্রমাণিত এমন নয়, বরং খোদ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর পবিত্র কুরআন রাখার জায়গাকে বরকতপূর্ণ মনে করে সেখানে বিভিন্ন আমল করতেন। সহীহ মুসলিমে হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে যেখানে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। 

حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، - وَاللَّفْظُ لاِبْنِ الْمُثَنَّى - قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ مَسْعَدَةَ، - عَنْ يَزِيدَ، - يَعْنِي ابْنَ أَبِي عُبَيْدٍ - عَنْ سَلَمَةَ، - وَهُوَ ابْنُ الأَكْوَعِ أَنَّهُ كَانَ يَتَحَرَّى مَوْضِعَ مَكَانِ الْمُصْحَفِ يُسَبِّحُ فِيهِ ‏.‏ وَذَكَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَتَحَرَّى ذَلِكَ الْمَكَانَ وَكَانَ بَيْنَ الْمِنْبَرِ وَالْقِبْلَةِ قَدْرُ مَمَرِّ الشَّاةِ ‏.‏

 

১০১৮। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ও মুহাম্মদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) ... সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি তাসবীহ ও নফল সালাত (নামায/নামাজ)-এর জন্য মুসহাফ (কুরআন) রাখার স্থান লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতেন । এবং বলতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ স্থানটিত লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতেন। আর মিম্বার ও কিবলার মধ্যকার স্থান একটি ছাগল যেতে পারে এই পরিমাণ ছিল।

 

এই হাদীসে স্পষ্টভাবে কুরআন রাখার জায়গাকে গুরুত্ব দিয়ে সেখানে তাসবীহ ইত্যাদি আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আর এটি নবীজীও করতেন। নবীজীর অনুসরণে হযরত সালামাহ ইবনুল আকওয়া একই কাজ করেছেন। 

উপরে ইবনে তাইমিয়া তার মতের পক্ষে একটি ঐকমত্যের দাবী করেছেন, অন্য দিকে একই বিষয়ে ইমাম নববী রহ: ঠিক উল্টো দাবী করেছেন। উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে ইবনে তাইমিয়ার দাবীর অসারতা এমনিতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। চলুন এ বিষয়ে ইমাম নববী রহ: এর বক্তব্যটি দেখে নেয়া যাক। 

 

মুসলিম শরীফে হযরত সাহাল বিন সা’য়াদ রা: এর একটি লম্বা হাদীস রয়েছে। উক্ত হাদীসের শেষ অংশে রয়েছে, 

 

‏.‏ قَالَ سَهْلٌ فَأَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَئِذٍ حَتَّى جَلَسَ فِي سَقِيفَةِ بَنِي سَاعِدَةَ هُوَ وَأَصْحَابُهُ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ اسْقِنَا ‏"‏ ‏.‏ لِسَهْلٍ قَالَ فَأَخْرَجْتُ لَهُمْ هَذَا الْقَدَحَ فَأَسْقَيْتُهُمْ فِيهِ ‏.‏ قَالَ أَبُو حَازِمٍ فَأَخْرَجَ لَنَا سَهْلٌ ذَلِكَ الْقَدَحَ فَشَرِبْنَا فِيهِ قَالَ ثُمَّ اسْتَوْهَبَهُ بَعْدَ ذَلِكَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَوَهَبَهُ لَهُ

সাহল (রাঃ) বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন ফিরে এসে তার সাহাবীদের সাথে বনু সাঈদার সাকীফায় (বৈধ জায়গায়) উপবেশন করেন। এরপর তিনি সাহলকে বললেন, আমাদেরকে কিছু পান করাও। সাহল বলেনঃ পরে আমি একটি পেয়ালাটি বের করে তাদের সকলকেই তা থেকে পান করিয়েছিলাম। আবূ হাযিম (রহঃ) বলেন, সাহল (রাঃ) আমাদের সামনে পেয়ালাটি বের করলে আমরা তাতে পান করলাম। তারপর উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) তা চাইলে, তিনি তাঁকে সেটি দান করেন। 

মুসলীম: হা: ৫০৬৬

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববীর বক্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম নববী রহ: বলেন,

 

‏ ‏قَوْله : ( فَأَخْرَجَ لَنَا سَهْل ذَلِكَ الْقَدَح فَشَرِبْنَا مِنْهُ , قَالَ : ثُمَّ اِسْتَوْهَبَهُ بَعْد ذَلِكَ عُمَر بْن عَبْد الْعَزِيز فَوَهَبَهُ لَهُ ) ‏ ‏يَعْنِي : الْقَدَح الَّذِي شَرِبَ مِنْهُ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

هَذَا فِيهِ التَّبَرُّك بِآثَارِ النَّبِيّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا مَسَّهُ أَوْ لَبِسَهُ , أَوْ كَانَ مِنْهُ فِيهِ سَبَب , وَهَذَا نَحْو مَا أَجْمَعُوا عَلَيْهِ وَأَطْبَقَ السَّلَف وَالْخَلَف عَلَيْهِ مِنْ التَّبَرُّك بِالصَّلَاةِ فِي مُصَلَّى رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الرَّوْضَة الْكَرِيمَة , وَدُخُول الْغَار الَّذِي دَخَلَهُ النَّبِيّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَغَيْر ذَلِكَ , وَمِنْ هَذَا إِعْطَاؤُهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبَا طَلْحَة شَعْره لِيَقْسِمهُ بَيْن النَّاس , وَإِعْطَاؤُهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِقْوَة لِتُكَفَّن فِيهِ بِنْته رَضِيَ اللَّه عَنْهَا , وَجَعَلَهُ الْجَرِيدَتَيْنِ عَلَى الْقَبْرَيْنِ , وَجَمَعَتْ بِنْت مِلْحَانِ عَرَقَهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , وَتَمَسَّحُوا بِوُضُوئِهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَدَلَّكُوا وُجُوههمْ بِنُخَامَتِهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , وَأَشْبَاه هَذِهِ كَثِيرَة مَشْهُورَة فِي الصَّحِيح , وَكُلّ ذَلِكَ وَاضِح لَا شَكّ فِيهِ

 

অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু এর ব্যবহৃত জিনিস, নবীজী যা স্পর্শ করেছেন, যা পরিধান করেছেন বা নবীজীর সাথে সম্পর্কি জিনিসের মাধ্যমে বরকত অর্জন করার বিষয়টি এই হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। এই বিষয়ে সকলেই ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সালাফ ও খালাফ সকলেই একমত হয়েছেন যে, পবিত্র রওজায় তারা নবীজীর নামাজের জায়গাকে নিজেদের নামাজের জায়গা বানিয়ে বরকত হাসিল করেছেন, নবীজী যে গোহায় প্রবেশ করেছেন সেখানে প্রবেশ করে তারা বরকত হাসিল করেছেন। ইত্যকর অসংখ্য বিষয় রয়েছে। এজাতীয় একটি বিষয় হলো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু তালহা রা: কে নিজের চুল মোবারক দিয়েছিলেন সাহাবীদের মাঝে বন্টনের জন্য। এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কন্যার কাফনের জন্য নিজের পরিধানের কাপড় দিয়েছিলেন। একইভাবে দু’টি কবরের উপর নবীজী দু’টি ডাল দিয়েছিলেন (যাতে কবরের আজাব কমে যায়), হযরত বিনতে মিলহান নবীজীর ঘাম জমা করেছিলেন, নবীজীর ওজুর অবিশষ্ট পানি সাহাবায়ে কেরাম বরকতের জন্য নিজেদের মুখে মেখে নিতেন, একইভাবে নবীজীর নাকের সরদিও সাহাবীরা মুখে মেখে নিতেন। এজাতীয় অসংখ্য বিষয় সহীহ সহীহ হাদীসে রয়েছে যা খুবই প্রসিদ্ধ। এগুলো এতো স্পষ্ট যে, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। 

[শরহে মুসলিম লিন-নববী, ৩৬৫৫ নং হাদীসের ব্যাখ্যা ]

 

উপরে আমরা ইবনে তাইমিয়ার একটি দাবী দেখে এসেছি, যেখানে তিনি বলেছেন, ইবনে উমর রা: ছাড়া কেউ নবীজীর নামাজের জায়গায় নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বরকত হাসিলের চেষ্টা করেননি। অন্য দিকে ইমাম নববী রহ: পূর্ববর্তী ও পরবর্তী (সালাফ ও খালাফ) সকলের ইজমা ও ঐকমত্যের দাবী করেছেন যে, সকলেই নবীজীর নামাজের জায়গাকে বরকত হাসিলের জায়গা বানিয়েছেন। উপরের দলিলের আলোকে প্রিয় পাঠক সিদ্ধান্ত নিবেন, কে তার দাবীতে সঠিক? উপরে যে ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: বলেছেন, ইবনে তাইমিয়া তার মতের পক্ষে মিথ্যা ইজমার দাবী করে, বিষয়টি এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি। এধরণের মিথ্যাচার ও প্রতারণা তার জন্য খুব সাধারণ বিষয়। আল-ইয়াজু বিল্লাহ। 

 

ইবনে তাইমিয়া যে ইবনে উমর রা: এর উপর মিথ্যা অভিযোগ করেছেন যে, তিনি ছাড়া কোন সাহাবী নবীজীর নামাজের জায়গা খুঁজে নামাজ আদা করেননি, এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করছি। সুনানে নাসায়ীতে রয়েছে, 

 

أَخْبَرَنَا سَعِيدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ الْأُمَوِيُّ، ‏‏‏‏‏‏قال:‏‏‏‏ حَدَّثَنَا أَبِي، ‏‏‏‏‏‏قال:‏‏‏‏ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، ‏‏‏‏‏‏عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، ‏‏‏‏‏‏عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، ‏‏‏‏‏‏أَنَّ أُمَّ سُلَيْمٍ سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْتِيَهَا فَيُصَلِّيَ فِي بَيْتِهَا فَتَتَّخِذَهُ مُصَلًّى، ‏‏‏‏‏‏ فَأَتَاهَا فَعَمِدَتْ إِلَى حَصِيرٍ فَنَضَحَتْهُ بِمَاءٍ، ‏‏‏‏‏‏فَصَلَّى عَلَيْهِ وَصَلَّوْا مَعَهُ

সা’ঈদ ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল উমাবী (রহ.) ..... আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, উম্মু সুলায়ম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আবেদন করলেন, তিনি যেন তার কাছে এসে তার ঘরে সালাত আদায় করেন। তাহলে তিনি ঐ স্থানকে সালাতের স্থান ঠিক করে নিবেন। তিনি তার ঘরে আসলেন, তখন তিনি একটি চাটাইয়ের ব্যবস্থা করলেন এবং পানি দ্বারা তা মুছে ফেললেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ওপর সালাত আদায় করলেন এবং অন্য লোকেরাও তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করলেন।

সুনানে নাসায়ী: হা: ৭৩৮

হযরত উম্মে সুলাইম রা:ও নবীজীকে আবেদন করেছেন তার ঘরে এসে নামাজ আদায় করার জন্য। যেন তিনি নবীজীর আদায় করা জায়গায় নামাজ আদা করতে পারেন। ইতবান বিন মালিক রা: এর মতো নবীজী এখানেও উপস্থিত হয়ে তার ঘরে নামাজ আদায় করেছেন। সাহাবায়ে কেরাও নবীজীর সাথে উপস্থিত ছিলেন। এভাবে সাহাবীদের জামায়াত নিয়ে বিভিন্ন সাহাবীর ঘরে নবীজী নামাজ আদায় করেছেন যেন সেটিকে পরবর্তীতে নামাজের জায়গা বানান হয়, অথচ ইবনে তাইমিয়া দাবী করছেন, এটি ইবনে উমর রা: ছাড়া কেউ-ই আমল করেননি। অথচ সাহাবীদের জামায়াত নিয়ে এভাবে নামাজ আদায় করার মাধ্যমে বিষয়টি শুরু থেকে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে প্রসিদ্ধ হওয়ার কথা। এই প্রসিদ্ধ বিষয়কে উল্টিয়ে দিয়ে ইবনে উমর রা: এর উপর শিরক-বিদয়াতের অপবাদ দেয়া ইবনে তাইমিয়ার কতো বড় ধৃষ্ঠতা একটু ভেবে দেখুন। 

 

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথে সম্পর্কি জিনিসের মাধ্যমে বরকত হাসিলের এতো বেশি দলিল বর্ণিত আছে যে, কোন অন্ধ বা প্রবৃত্তিপূজারী ছাড়া এটি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। যা ইমাম নববী রহ: স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বিষয়গুলো এতো বেশি প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত যে, এগুলো নিয়ে সংশয় - সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। অথচ নজদী-তাইমীরা এসব দলিলকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বিষয়কে ইয়াহুদী মুসা  ইবনে মাইমুনের শেখান শিরকের দর্শনের কারণে সব কিছুকে শিরকের মাধ্যম বানাবার চেষ্টা করে থাকে।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83