নজদী - তাইমীরা সুযোগ পেলেই প্রকাশ্যে অথবা আকারে - ইংগিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অসম্মান ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। নবীজীকে অসম্মানের এই নিকৃষ্ট চরিত্র তারা উত্তরাধিকার সূত্রে ইবনে তাইমিয়ার কাছ থেকে পেয়েছে। ইবনে তাইমিয়া এই নবী-বিদ্বেষ গ্রহণ করেছে ইয়াহুদীদের কাছ থেকে। বিষয়টি এমন নয় যে, এটি শত শত বছর পরে আমরা আবিষ্কার করছি। বরং এটি একেবারে শুরু থেকেই উলামায়ে কেরাম বলে আসছেন যে, ইবনে তাইমিয়ার এই নবী-বিদ্বেষী দর্শন মূলত: ইয়াহুদীদের কাছ থেকে নেয়া। কারণ, ইয়াহুদীরা শুরু থেকেই নবীজীর সত্ত্বার প্রতি বিদ্বেষ লালন করত। প্রকাশ্যে তাদের বিদ্বেষ চরিতার্থ করার পাশাপাশি এদের অনেকে নামে মাত্র ইসলাম গ্রহণ করে মুনাফিক হিসেবে নবীজীকে অসম্মান করার চেষ্টা করত। এই ইয়াহুদী মোনাফিক গোষ্ঠীর বিভিন্ন দর্শন দ্বারা পরবর্তীদের অনেকে নবী-বিদ্বেষ চর্চা করেছে।ন
ইবনে তাইমিয়া বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্য - অপ্রকাশ্য দু'ভাবেই নবীজীকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছে। এমনকি যারা নবীজীকে শরয়ী সীমার মাঝে সম্মান ও তা'জীম করেছেন, তাদেরকে শিরকের অপবাদ দিয়েছে। তার এই শিরকের অপবাদ থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: এর মতো সাহাবীও মুক্ত ছিলেন না। ইবনে উমর রা: কে ইবনে তাইমিয়া অপবাদ দিয়েছে যে, তিনি নবীজী যেখানে যেখানে নামাজ আদায় করেছেন, বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে সেসব জায়গায় নামাজ আদায় করার কারণে শিরকের দরজা খুলে দিয়েছেন। ইন্নালিল্লাহ। আউজুবিল্লাহ। এভাবে সাহায়ে কেরাম থেকে শুরু করে পুরো মুসলিম উম্মাহের অধিকাংশকে শিরকের অপবাদ দিয়েছে তার বিভিন্ন লেখনীতে। এসব কিছু গ্রহণ করেছে, ইয়াহুদীদের নানা দর্শন থেকে। ইবনে উমর রা: কে ইবনে তাইমিয়ার দেয়া অপবাদের বিষয়ে পরবর্তীতে মূল কিতাবের ছবিসহ বিস্তারিত লিখব ইনশা আল্লাহ।
ইমাম ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: (৭৫২-৮২৯ হি:) তার 'দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা' কিতাবের বিভিন্ন জায়গায় ইবনে তাইমিয়ার এই নবী - বিদ্বেষের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে, ইবনে তাইমিয়ার নবী-বিদ্বেষের একটি বড় উসূল ছিলো, নবীজীর ইন্তেকালের পর তার বিভিন্ন ফজীলত অস্বীকার করে জীবিত ও ইন্তিকালের পরবর্তী অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করা। যেমন, জীবিত অবস্থায় নবীজীর অসিলা করা জায়েজ হলেও ইন্তিকালের পর ওসিলা করা নাজায়েজ। এভাবে নবীজীর জীবিত থাকা ও ইন্তিকালের পরবর্তী বিষয়ের মাঝে পার্থক্য করার এই নিকৃষ্ট মতবাদটি মূলত: সে ইয়াহুদীদের কাছ থেকে নিয়েছে। এই কিতাবের ৬৬ পৃষ্ঠায় ত্বকিউদ্দীন হাসানী রহ: লিখেছেন,
" ইমাম আল্লামা তার সময়ের শাইখুল ইসলাম আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাইল স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইবনে তাইমিয়া জাহেলদের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। কারণ, সে কী বলত, সেটা নিজেই অনুধাবন করত না। তিনি বলেন, ইবনে তাইমিয়া নবীজীর জীবন ও ইন্তিকালের মাঝে পার্থক্যের এই বিষয়টি তার এক উস্তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। যেই উস্তাদ এই দর্শনটি ইয়াহুদী ও সামেরীদের অনুসারীদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও ভেতরে ভেতরে নবীজীর চরম শত্রু ছিলো। এরকম বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণকারী নবী-বিদ্বেষীদের একজনকে হযরত আলী রা: তার মজলিশে নবীজীকে অসম্মান করে কথা বলায় হত্যা করেছিলেন।'
[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ৬৬ ]


এই কিতাবের ৯৮ পৃষ্ঠা থেকে ত্বকিউদ্দীন হাসানী রহ: বিষয়টি নিয়ে আরও লম্বা আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন,
" ইবনে তাইমিয়ার যেসব মতাদর্শ নিয়ে সমালোচনা করা হয়, এর মধ্যে এই বিষয়টি সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও খুবই জঘন্য পর্যায়ের একটি বিষয় হলো, নবীজীর জীবিত থাকা ও ইন্তিকালের পরবর্তী অবস্থার মাঝে পার্থক্য করা। এই মাসআলাটি যেসব ইয়াহুদী মুনাফিক মুসলমান হয়েছিল, তারা এর উদ্ভাবন করেছে। এভাবে তারা নবীজীর আদেশের বিরোধিতা করত। পরবর্তীতে এসব মুনাফিকদের অনুসারীরাও একই মতাদর্শের উপর চলতে থাকে। এরা যদিও প্রকাশ্যে নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিত কিন্তু এদের অন্তর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদ্বেষে পরিপূর্ণ ছিলো। তারা তাদের বিদ্বেষ চরিতার্থ করার জন্য নবীজীর ইন্তিকালের মাধ্যমে তার মর্যাদাকে খাটো করার রাস্তা বের করেছে। এ বিষয়ে বিখ্যাত ইমামগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমি তাদের বিভিন্ন উল্লেখ করে উপসংহারে কুরআন সুন্নাহের বিভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করব। এগুলোর মাধ্যমে নবীজীর ইন্তিকালের পরও তার মর্যাদা, সম্মান, কবরে জীবিত থাকা এবং জীবিত অবস্থায় নবীজীর যেমন সম্মান ও আজমত ছিলো, এখনও তেমনই আছে, ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট হবে। এগুলো পড়ে পাঠক নিশ্চিৎভাবে উপলব্ধ করতে পারবে যে, নবীজীর জীবন ও ইন্তিকালের মাঝে যারা পার্থক্য করে, তারা কতো বড় জিন্দিক ও ভ্রষ্ট। এটাও স্পষ্ট হবে যে, যেই ইবনে তাইমিয়াকে ইলমের সমুদ্র বলা হতো, তার ব্যাপারে অন্যান্য কিছু আলিম যে বলেছেন যে সে মুতলাক জিন্দিক ছিলো; তাদের এ বক্তব্য যে অমূলক নয়, সেটাও স্পষ্ট হবে। তার ব্যাপারে ইমামদের এধরণের বক্তব্যের কারণ হলো, তার কিতাবাদি পড়ার পর এটা স্পষ্ট যে, তার আকিদার কোন স্থিরতা নেই। কোথাও কোন একটা ফেরকার আকিদাকে ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী বলার পর দেখা গেছে ওই ফেরকার আকিদাকে সে গ্রহণ করেছে। এছাড়া তার কিতাবাদি দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদি আকিদায় ভরা, ইশারা - ইংগিতে নবীজীকে অসম্মান করা, আবু বকর ও উমর রা: কে অসম্মান করা, হযর ইবনে আব্বাস রা: কে তাকফির করে তাকে মুলহিদ বলা, হযরত ইবনে উমর রা: কে অপরাধী, বিদয়াতী, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি আখ্যা দেয়া ইত্যাতি তার কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে শেষোক্ত বিষয়টি তার ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম কিতাবে এসব রয়েছে।
[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ৯৮]

ইমাম ত্বকিউদ্দীন হুসোনী রহ: একই কিতাবের ৯৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
"ইবনে তাইমিয়ার যেসব বিষয়ে সমালোচনা করা হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো, নবীজীর নবুওয়াতের বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসকে অস্বীকার করা যেখানে হযরত আদম আ: এর সৃষ্টির পূর্বে নবীজীর নবুওয়াতের কথা রয়েছে। যেমন, হযরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, সাহাবীরা নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কখন আপনার নবুওয়াতকে আবশ্যক করা হয়েছে বা কখন আপনাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে, নবীজী বললেন, যখন আদম আ: তার রুহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। বা কাছাকাছি শব্দে এই হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এই জাতীয় হাদীসগুলোর ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়া এমনভাবে আলোচনা করেছেন যাতে সাধারণ মানুষের সামনে ধুম্রজাল তৈরি করা যায় এবং অবুঝ লোকরা যেন বিভ্রান্ত হয়। এর দ্বারা মূলত: তার উদ্দেশ্য নবীজীকে অসম্মান করা, নবীজীর সম্মান ও মর্যাদাকে খাটো করা। যেসব জায়গায় নবীজীর মর্যাদা প্রকাশ পায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে চুপ থাকে। যাতে অন্যান্য আলিমরা বুঝে যে, তার অন্তর আল্লাহর রাসূলের আজমত ও মহব্বত, আল্লাহ যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন সেগুলোতে টই-টুম্বুর।
এই খবীস নবীজীর সম্মান খাটো করার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত। কখনও স্পষ্ট ভাষায়, কখনও নিকটবর্তী ইংগিতের মাধ্যমে আবার কখনও দূরবর্তী ইংগিতের মাধ্য়মে নবীজীর মর্যাদাকে খাটো করতে চায়। অভিজ্ঞ উলামারা তার এই আকার - ইংগিত বুঝতে পারেন। "
[দাফউ শুবাহি মান শাব্বাহা ও তামাররাদা, পৃ: ৯৩ ]

এখানে ইমাম ত্বকিউদ্দনী হুসোনীর লম্বা আলোচনার সামান্য কিছু অংশ উল্লেখ করেছি। বিষয়টি আসলে খুবই বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে। পরবর্তী পর্রে ইনশা আল্লাহ ইবনে উমর রা: এর উপর কীভাবে ইবনে তাইমিয়া বিদয়াত, শিরকের দরজা খোলা ইত্যাদি জঘন্য অপবাদ আরোপ করেছেন বিষয়ে বিস্তারিত লিখব।
------ ------
আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।
© COPYRIGHT 2021 - Hasbi Academy - We Love Our Students