ঈমান-আক্বিদা

ভ্রান্তির বেড়াজালে সালাফী আক্বিদা (পর্ব-১)

ইজহারুল ইসলাম রবি, 12 সেপ্টে., 2021
60

বর্তমান সালাফীরা সম্পূর্ণভাবে দেহবাদী আকিদায় বিশ্বাসী। তারা মূলত: ভ্রান্ত ফেরকা কাররামিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাস লালন করে। এসব ভ্রান্ত আকিদাকেই তারা তথাকথিত সহীহ আকিদা হিসেবে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সালাফীদের অন্যতম একটি আকিদা হল, আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন। শুধু তাই নয়,  আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে তার পাশে বসাবেন এটা তাদের মৌলিক আকিদা।  এই ভ্রান্ত ইহুদী আকিদাটি সালাফীদের অনেক বিখ্যাত শায়খ তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষভাবে তাদের মান্যবর ও অনুসরণীয় আলেম ইবনে তাইমিয়া রহ. ও ইবনুল কাইয্যিম রহ. তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আমরা ইতোপূর্বে এ বিষয়ে সালাফীদের নিকট অতীতের শায়খদের বক্তব্য আলোচনা করেছি। আজকের পর্বে পূর্ববর্তী শায়খদের বক্তব্য প্রমাণসহ উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।

ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য:

১. ইবনে তাইমিয়া রহ. তার মাজমাতুল ফাতাওয়া (খ.৪, পৃ.২২৯) বলেছেন,

إذا تبين هذا فقد حدث العلماء المرضيون وأولياؤه المقبولون أن محمدا رسول الله يجلسه ربه على العرش معه

” গ্রহণযোগ্য আলেমগণ ও আল্লাহর প্রিয় ওলীগণ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর রাসূল স. কে তার পাশে বসাবেন।

তার মতে আরশের উপর আল্লাহর পাশে রাসূল স. এর উপবেশনের আকিদাটি সঠিক আকিদা। এটি জাহমিয়া ছাড়া কেউ অস্বীকার করে না।  অর্থাৎ আল্লাহর আরশে উপবেশনের আকিদাটি অস্বীকার করলে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মতে সে জাহমিয়া ।

স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:

২.ইমাম আবু হাইয়্যান উন্দুলুসী রহ. [মৃত:৭৫৪ হি:] বিখ্যাত মুফাসসির ছিলেন। আল-বাহরুল মুহীত তার অমর কীর্তি। ইমাম আবু হাইয়্যান উন্দুলুসী রহ. ইবনে তাইমিয়া রহ. এর সম-সাময়িক ছিলেন। আবু হাইয়্যান উন্দুলুসী রহ. তার তাফসীরে লিখেছেন,

” আমাদের সম-সাময়িক ইবনে তাইমিয়ার নিজ হাতে লেখা “আল-আরশ” নামক কিতাবে দেখেছি, আল্লাহ তায়ালা কুরসীর উপর উপবেশন করবেন। কুরসীর কিছু অংশ ফাকা থাকবে।  যেখানে রাসূল স. উপবেশন করবেন”

[আল-বাহরুল মুহীত, খ.২, পৃ.২৫৪ , আয়াতুল কুরসীর তাফসীর]

স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:

৩. ইবনে তাইমিয়া রহ. বয়ানু তালবিসিল জাহমিয়া (খ.৩, পৃ.২৭৮) তে লিখেছেন, “আরশের শাব্দিক অর্থ হল, উপরের দিকের বিবেচনায় এটি খাট বা সিংহাসন এবং নীচের দিকের বিবেচনায় এটি ছাদ।  কুরআনে যেহেতু আল্লাহর জন্য আরশ সাব্যস্ত করা হয়েছে, আল্লাহর ক্ষেত্রে যেহেতু এটি ছাদ নয়, সুতরাং আল্লাহর জন্য আরশ হল সিংহাসন।  আরশ আল্লাহর সিংহাসন হওয়াটা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আরশের উপর রয়েছেন।

স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:

ইবনে তাইমিয়া রহ. এর আকিদা ছিল আল্লাহর ওজন বা ভার রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আরশে উপবিষ্ট রয়েছেন। এ বিষয়ে তার অনেক বক্তব্য রয়েছে। সংক্ষেপে আলোচনার উদ্দেশ্যে সেগুলো উল্লেখ করা হল না। পরবর্তীতে ইনশাআল্লাহ বিস্তারিত লিখবো।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর বক্তব্য:

১. ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার আল-বাদাইউল ফাওয়াইদ (খ.৪, পৃ.১৩৮০) এ একটি কবিতা উল্লেখ করেছেন।

ولا تنكروا أنه قاعد   ولا تنكروا أنه يقعده

অর্থ: তোমরা কখনও অস্বীকার করো না যে, আল্লাহ আরশে বসে আছেন। তোমরা এও অস্বীকার করো না যে, রাসূল স.কে আল্লাহ তায়ালা আরশে বসাবেন।

স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:

২. মুখতাসারুস সাওয়াকিল মুরসালা (পৃ.১০৯৬) কিতাবে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, আল্লাহ প্রকৃত অর্থে উপরের দিকে রয়েছেন। আল্লাহর উপরে থাকার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। এর একটি হল, আল্লাহ তায়ালা তার কুরসীর উপর উপবিষ্ট হন।

৩. খারিজা ইবনে মুসআব (পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী) থেকে ভিত্তিহীন (বর্ণনাকারী সাইদ ইবনে সাখর অজ্ঞাত) একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার সাওয়াইকুল মুরসালা কিতাবে। এই বর্ণনাটি শুধু ভিত্তিহীনই নয়, জঘন্য আকিদা প্রচার করা হয়েছে এর মাধ্যমে। এধরনের ভ্রান্ত আকিদা পোষণ না করলে  কুফুরীর ফতোয়াও দেয়া হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।  ইবনুল কাইয়্যিম রহ. লিখেছেন, “খারিজা ইবনে মুসআব থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাহমিয়াগণ কাফের। তোমরা তাদের সাথে তোমাদের কন্যাদের বিবাহ দিও না। তাদের কারও মেয়ে বিবাহ করো না। তাদের অসুস্থদেরকে দেখতে যাবে না। তাদের মৃত ব্যক্তির জানাযায় অংশগ্রহণ করবে না। তাদের স্ত্রীদেরকে জানিয়ে দাও, তাদের স্ত্রী তালাক। স্বামীর জন্য তাদের স্ত্রী হালাল নয়। এরপর  তিনি সূরা ত্বহার পাচ নং আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করলেন। “আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর ইস্তেওয়া করেছেন। ‘ এই আয়াত তেলাওয়াত করে বললেন, বসা ব্যতীত কখনও কি ইস্তেওয়া হয়?”

[আস-সাওয়াইকুল মুরসালা, খ.১, পৃ.১৩০৩]

প্রিয় পাঠক, প্রথমে আমরা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করেছি যে, আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে আরশের উপর তার পাশে বসাবেন এটি কেবল জাহমিয়ারা অস্বীকার করে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন এই আকিদা অস্বীকার করলে সে জাহমিয়া হয়ে যাবে। একই কথা ইবনুল কাইয়্যিম রহ.  উল্লেখ করলেন। তিনি শুধু জাহমিয়া বলেই ক্ষ্যান্ত হননি, খারিজা ইবনে মুসআবের সুত্রে এদেরকে কাফের সাব্যস্ত করেছেন। এদের জানাযায় অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। স্ত্রী তালাক হয়ে বলে ফতোয়া দিয়েছেন।

সালাফী ভাইদের কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা, বর্তমানে কিছু সালাফীকে দেখা যায়, তারা আরশে বসে থাকার আকিদা অস্বীকার করেন। সালাফী শায়খ শহীদুল্লাহ খান মাদানী একে সমাসীন বা বসে থাকার আকিদাকে বিদয়াতও বলেছেন। আমাদের প্রশ্ন হল, আল্লাহ আরশে উপবিষ্ট থাকার আকিদাকে যারা অস্বীকার করছে,

১.তারা কি মুসলমান না কাফের?

২. তাদের স্ত্রী হালাল না কি তালাক হয়ে যাওয়ার কারণে হারাম?

৩. তাদের জানাযায় অংশগ্রহণ করা বৈধ না কি অবৈধ?

৪.এদের কেউ অসুস্থ হলে অন্যান্য সালাফীরা কি তাকে দেখতে যেতে পারবে?

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শহীদুল্লাহ খান মাদানী এই আকিদাকে বিদয়াত বলেছে। সুতরাং খারিজা ইবনে মুসআবের সুত্রে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. যেই ফতোয়া দিলেন, এর আলোকে আমরা কী বুঝতে পারি? শহীদুল্লাহ খান মাদানীর স্ত্রী তার জন্য হালাল না হারাম? সে মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযায় অন্যান্য সালাফীরা কি অংশগ্রহণ করতে পারবে?

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. যেহেতু তার কিতাবে এটি সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন, সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের জানতে চাওয়াটা কখনও অযৌক্তিক হতে পারে না। এটির সমাধান হওয়া জরুরি। আশা করি সালাফী ভাইয়েরা অন্যদেরকে জাহমিয়া, মুয়াত্তিলা বলে গালি দেয়ার আগে নিজের অবস্থান যাচাই করবেন। তাদের মান্যবর শায়খদের ফতোয়া অনুযায়ী তারা নিজেরাই জাহমিয়া হয়ে আছে কি না সেটাও যাচাই করা জরুরি। তাদের স্ত্রী হালাল রয়েছে কি না সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য আলেমদেরকে কুফুরী-শিরকের অপবাদ দেয়ার আগে আপনাদের শায়খদের ফতোয়া অনুযায়ী আপনাদের ইমানটাও যাচাই করা আবশ্যক। আশা করি, সালাফী ভাইয়েরা বিশেষভাবে শহীদুল্লাহ খান মাদানী বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83