আক্বিদা

তথাকথিত সালাফী আলেমদের আক্বিদাগত মতবিরোধ (পর্ব-১)

ইজহারুল ইসলাম রবি, 12 সেপ্টে., 2021
30

ইসলামের মূল হলো একজন মানুষের বিশ্বাস। আল্লাহ সম্পর্কে বিশ্বাস। আল্রাহর নবী-রাসূল, ফেরেশতা ও পরকাল সম্পর্কে বিশ্বাস। এ বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই অন্যান্য বিধি-বিধান আরোপিত হয়। বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা, আকিদার পরিশুদ্ধি একজন মানুষকে খাটি মুসলমান বানাতে পারে। মৌখিক স্বীকারোক্তি বা আনুষ্ঠানিক বিধি-বিধান পালনের পূর্বশর্ত আত্মিক বিশ্বাস। একজন মানুষ তখনই কেবল খাটি মুসলমান হিসেবে পরিগণিত হবে, যখন সে আমল ও স্বীকারোক্তির পাশাপাশি পরিশুদ্ধ বিশ্বাস লালন করবে। অন্তরের গহীন থেকে অন্ধরাচ্ছন্ন বিশ্বাসকে ইমানের আলোয় আলোকিত করবে। সহীহ আকিদার বৃক্ষটি যখন তার অন্তরে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে থাকবে, তখনই কেবল সে সিরাতাল মুস্তাকীমের পথে অগ্রসর হতে থাকবে। তার অন্তরে প্রোথিত বিশ্বাসের বৃক্ষটির মূল হবে  হবে অনড়,  শাখা-প্রশাখা হবে গগনচুম্বী। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী এমন বস্তুনিষ্ঠ অবিচল বিশ্বাসকেই কালিমায়ে তৈয়্যেবার বিশ্বাস বলা হয়েছে। এটিই মূলত: সহীহ আকিদার মূলমন্ত্র। অন্তরের এমন পরিশুদ্ধ ও দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নেয়ামত। এই নেয়ামত কেবল রাসূল স. এর সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথের পথিকদেরকেই দান করা হয়। অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ বা সুন্নতের অনুসারী এবং আহলুল জামায়া বা সাহাবায়ে কেরামের জামাতের সাথে চলার ব্যাপারে যারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তারাই কেবল এই নেয়ামতের ছায়াতলে আশ্রয় পেয়ে থাকেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বাইরে যতো মত, দল, মতবাদ বা মতাদর্শ রয়েছে, তারা সহীহ আকিদার নেয়ামত থেকে বন্চিত। সহীহ আকিদা থেকে বন্চিত হওয়ার কারণেই তারা বিপথগামী হয়েছে। বাহাত্তর দলের অন্তুর্ভূক্ত হয়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত সহীহ ও বাতিল আকিদার এই ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু আকিদার অনুসারী থাকবে, যারা সহীহ আকিদার অনুসারী আবার কিছু লোক থাকবে বাতিল ও ভ্রান্ত পথের অনুসারী। এটা চিরাচরিত নিয়ম।

বর্তমানে বাতিল আকিদার অন্যতম একটি ফেরকা হলো তথাকথিত সালাফী আকিদার অনুসারীগণ। এরা সালাফ শব্দ ব্যবহার করে মানুষের মাঝে এই ধারণা প্রচার করে থাকে যে, তারা সালাফে সালেহীনের অনুসারী। আমি তাদের সালাফী পরিচয়ে কোন দোষ দেখি না। তবে তারা সালাফে সালেহীনের অনুসারী নয়। পূর্ববর্তী ভ্রান্ত দল কাররামিয়াদের অনুসারী। তারা যেহেতু পুর্ববতী ভ্রান্ত দল কাররামিয়াদের অনুসারী একারণে তাদেরকে সালাফী বলেই উল্লেখ করবো। তবে মনে রাখতে হবে, এদের পূর্ববতী অনুসরণীয়-অনুকরণীয় দল হলো ভ্রান্ত ফেরকা কাররামিয়া। 

বর্তমানের সালাফীরা আশ্চর্যজনকভাবে আকিদার পরিশুদ্ধির কথা বলে থাকে। সহীহ আকিদার ব্যবহার তাদের মাঝে একটু বেশিই দেখা যায়। এধরনের অপপ্রচার তাদের বাতিল আকিদাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের অপচেষ্টা বৈ কিছুই নয়। বাতিল আকিদাকে যে লেবেল, বিশেষণ, নাম বা পরিচিতি দেয়া হোক না কেন, বাতিল বাতিলই থাকে। কাররামিয়ারা যদি নিজেদেরকে মুহাদ্দিস হিসেবে, ফকীহ হিসেবে, আসারী হিসেবে বা সালাফী হিসেবে প্রকাশ করে, তাহলে এসব লেবেল লাগানোর কারণে তাদের আকিদা কখনো বিশুদ্ধ হয়ে যাবে না। হাদীস অস্বীকারকারীরা যেমন বাতিল হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে আহলে কুরআন (কুরআনের অনুসারী) প্রকাশ করে থাকে, আহলে হাদীসরা যেমন ফিকাহ অস্বীকার করে নিজেদেরকে হাদীসের অনুসারী প্রকাশ করে থাকে, ঠিক তেমনি বাতিল আকিদার অনুসারী হয়েও তথাকথিত সালাফীরা নিজেদেরকে সহীহ আকিদার দাবী করে। অথচ বাস্তবে তারা সহীহ আকিদা থেকে যোজন যোজন দূরে। যেমন আহলে কুরআন সম্প্রদায় কুরআনের অনুসরণ থেকে বন্চিত, আহলে হাদীস সম্প্রদায় যেমন হাদীস অনুসরণের দাবী করেও হাদীস অস্বীকারকারীদের ভূমিকায় অবতীর্ণ ঠিক তেমনি সালাফে সালেহীনের আকিদার অনুসরণে দাবীদার সালাফী সম্প্রদায় বিশুদ্ধ আকিদা থেকে দূরে অবস্থিত। 

আমাদের এই বক্তব্য কোন অত্যুক্তি নয়। কারও বিষোদগারের উদ্দেশ্যে অতিরণ্জনও নয়।  বরং বাস্তবতা এর চেয়ে মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর। এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবেই বিষয়গুলোর অবতারণা। বিজ্ঞ পাঠক, মূল আলোচনায় ইনশাআল্লাহ এই বাস্তবতাই দেখতে পাবেন। 

কাররামিয়াদের আকিদাগুলোকেই মূলত: নতুন মোড়কে সালাফী আকিদা নামে প্রচার করা হচ্ছে। লেবেল ও মোড়ক নতুন হলেও জিনিসে কোন পবিবর্তন হয়নি। বরং পুরোটাই কাররামিয়া আকিদার নতুন সংস্করণ। কাররামিয়া আকিদার মূল উৎস হলো ইসরাইলী রেয়াত তথা ইহুদী আকিদা। কাররামিয়া আকিদার মূল ভিত্তি হলো ইহুদীদের বিকৃত আকিদা। এভাবে কাররামিয়াদের সূত্র ধরে ইসলামে ইহুদী আকিদার চর্চা হয়ে আসছে। বর্তমানে কাররামিয়া ও ইহুদীদের আকিদাগুলোই বিভিন্ন নামে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ এসব আকিদার সাথে ইসলামী আকিদার দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। সালাফী আকিদা, কাররামিয়া আকিদা বা আহলে হাদীস আকিদা যাই বলেন না কেন, এগুলোর মূল ভিত্তি হলো, ইহুদীদের থেকে বর্ণিত অসংখ্য জাল হাদীস। একারণে সালাফীদের উল্লেখযোগ্য আকিদার কিতাবগুলো অধিকাংশ আকিদার কিতাবে জাল বর্ণনার ছড়াছড়ি। শতকরা সত্তর থেকে আশি ভাগ জাল ও দুর্বল বর্ণনা এসব কিতাবের মূল উপজীব্য। এসব জাল বর্ণনা কোন ইসলমাী আকিদার প্রতিনিধিত্ব করে না,  বরং অধিকাংশ বর্ণনাই নেয়া হয়েছে ইহুদীদের কাছ থেকে। এভাবে কাররামিয়া ও সালাফী আকিদা অনেক ক্ষেত্রে ইহুদীদের আকিদার সাথে মিলে গেছে। সালাফীদের মৌলিক আকিদার কিতাবে জাল বর্ণনার পরিমাণ ও উৎস সম্পর্কে ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। 

সালাফী আলেমদের মাঝে মৌলিক আকিদার বিষয়ে স্ববিরোধীতা তাদের আকিদাগত বিচ্যুতি প্রমাণে যথেষ্ট। যেসব আকিদা স্বয়ং সালাফী আলেমদের দৃষ্টিতেই পরিত্যাজ্য, ভ্রষ্টতা সেসব আকিদা কীভাবে ইসলামী আকিদা হয়? সেগুলো কেন সহীহ আকিদার নামে ঘটা করে মুসলিম সমাজে প্রচার করা হয়? অথচ স্বয়ং সালাফী আলেমরাই এসব আকিদাকে ভ্রান্ত বলে থাকে।  সালাফী আলেমদের এসব স্ববিরোধীতা থেকে দু’টো বিষয় স্পষ্ট হবে, ১. সালাফী আকিদার অনুসারী অনেকেই ভ্রান্ত আকিদার মাঝে নিপতিত আছে। ভ্রান্ত আকিদায় নিপতিত এসব লোকের মাঝে আলেম ও সাধারণ মানুষ উভয়শ্রেণিই রয়েছে। ২. বর্তমানের সালাফী আকিদা মূলত: বিশুদ্ধ ইসলামী আকিদার প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর কারণ। 

সেই সালাফী আকিদার মৌলিক নীতিমালার দুর্বলতা, অসারতাও পাঠকের সামনে স্পষ্ট হবে। এদের প্রত্যেকটা মূলনীতিই যে ভঙ্গুর, স্ববিরোধীতায় ভরা, সে বিষয়েও যথেষ্ট ধারণা হবে। আমাদের এই পর্বগুলোতে শুধু তাদের স্ববিরোধী বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হবে। এগুলোর খন্ডন বা মূলনীতির অসারতা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা  করা হবে না। এ বিষয়ে ইনশাআল্লাহ আকিদা বিষয়ক বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। 

আকিদা বিষয়ে দীর্ঘ তিন চার বছর পড়া-শোনা করলেও এসব বিষয়ে অনেক দেরিতে কলম ধরছি। এর মূল কারণ, বিষয়বস্তুর স্পর্শকাতরতা ও সালাফী আলেমদের প্রতি সহানুভূতি।  আলেমদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন মূলত: দেওবন্দী আলেমদের একটি বিশেষ শান বা বৈশিষ্ট্য। তারা আলেমদের ভালো দিকগুলো আলোচনার চেষ্টা করেন। খারাপ দিকগুলো এড়িয়ে চলার শিক্ষা দেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইবনে তাইমিয়া রহ.। ইবনে তাইমিয়া রহ. এর অসংখ্য বাতিল আকিদা থাকা সত্ত্বেও দেওবন্দী আলেমগণ তার ভালো দিকগুলো সম্মানের সাথে আলোচনা করে থাকেন। যেমন, সাইয্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তার “সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস” বইয়ে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর  প্রশংসনীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে দেওবন্দী আলেমগণ ইবনে তাইমিযা রহ. বাতিল আকিদাগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। যেমন, বিখ্যাত দেওবন্দী আলেম আবু বকর গাজীপুরী তার ‘ কিয়া ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে আহলে সুন্নত মে হে” কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার বাতিল আকিদা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এছাড়াও মুফতী তাকী উসমানী দা.বা. ফতোয়ায়ে উসমানীতে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বাতিল আকিদা খন্ডন করেছেন। উলামায়ে দেওবন্দের এই কর্মপন্থায় কারও ধোকায় নিপতিত হওয়র সুযোগ নেই। বাতিল আকিদার কোন আলেমের ভালো দিক আলোচনার অর্থ এই নয় যে, দেওবন্দী আলেমগণ তাদের বাতিল আকিদা সমর্থন করে কিংবা তাদের সেসব বাতিল আকিদা নিজেরাও পোষণ করে। যারা উলামায়ে দেওবন্দের মানহাজ সম্পর্কে সচেতন নয়, তারাই কেবল এজাতীয় ক্ষেত্রে ধোকায় পড়তে পারে। নতুবা উলামায়ে দেওবন্দ কখনও হক ও বাতিলের মিশ্রণের পক্ষপাতী নয়| তারা কখনও ঐক্যের কথা বলে বাতিল আকিদা গ্রহণের দাওয়াত দেয় না। হক বিষয়কে হক হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে চিহৃিত করা ও তাদের থেকে সতর্ক করাই হলো দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মূল মিশন। 

 বর্তমানে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, বাতিলের প্রচারে মানুষকে বাতিলকে হক মনে করতে শুরু করেছে আর হককে বাতিল মনে করে করছে। হকপন্থীরা যখন চুপ থাকে, বাতিল মনে করে তারাই সত্যের উপর রয়েছে। এটি একটি  ধ্রুব সত্য। বর্তমানে আমরা এ বাস্তবতারই মুখোমুখি হচ্ছি  প্রতিনিয়ত। পরিশেষে সবার কাছে নিবেদন, সত্য গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে, হকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সহীহ আকিদার পথে পা বাড়াতে হবে। কারও প্রতি বিশেষ টান বা দুর্বলতা সত্য গ্রহণে যেন অন্তরায় না হয়। নিজেদের আকিদা বিশুদ্ধ করাটা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে তাদের আকিদা বিষয়ে সচেতন হওযা জরুরি। সেই সাথে উলামায়ে কেরামের কর্তব্য হলো, হক বিষয়কে মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং বাতিলের বিষয়ে সতর্ক করতে থাকে। তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন, আলেমদের ব্যাপারে আমরা ব্যক্তিগত আক্রোশের বহি:প্রকাশ না ঘটায়। প্রত্যেকের যথাযথ মর্যাদা ঠিক রেখে সত্য গ্রহণে প্রয়াসী হতে হবে। তবে বাতিলকে অবশ্যই বাতিল বলতে হবে। এতে বাতিল যদি নিজেদের মর্যাদার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে, তবে তাদেরকে সত্য গ্রহণের দাওয়াত দিতে হবে।  হক ও  বাতিলের মাঝে মিশ্রণ কখনও কাম্য নয়। ইসলামী ঐক্যের নামে হক ও বাতিলের মিশ্রণের দাওয়াতও বাস্তবতা বিরোধী। সুতরাং ঐক্যের ধুয়ো তুলে বা অন্য কোন কারণ দেখিয়ে বাতিলের বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা থেকে বিমুখ করার প্রয়াসটিও সঠিক নয়। এটিও প্রান্তিকতার দোষে দুষ্ট। বাতিলের প্রতি অন্যায় ভালোবাসা আর আবেগ থেকেই এধরনের ঐক্যের অজুহাত আসে। ইসলামী ঐক্য  যদি আসলেই কাম্য হয়, তবে তা হতে হবে দ্বিপক্ষীয়। এক পক্ষ তাদের বাতিল মতাদর্শ প্রচার করবে, আর অন্যদেরকে ঐক্যের ধুয়ো তুলে সত্য প্রকাশ থেকে দমিয়ে রাখা হবে, এটা কখনও কাম্য নয়। এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ থেকে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হেফাজত করুন। সেই সাথে  আল্লাহ পাক সবাইকে সহীহ আকিদা তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা গ্রহণের তৌফিক দান করুন। আমীন। 

আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন (নাউযুবিল্লাহ) 

আল্লাহ তায়ালা আরশে বসার আকিদার মূল উৎস হলো ইহুদী ধর্ম। ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালাকে আরশে বসা বা সমাসীন মনে করে। ইহুদীদের এই ঘৃণিত আকিদাটি গ্রহণ করেছে কাররামিয়ারা। কাররামিয়াদের অনুসারী হিসেবে তথাকথিত সালাফীরাও এটাকে তাদের আকিদা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে তাদের কেউ কেউ আবার এই আকিদাকে ভ্রান্ত আকিদা বলেও উল্লেখ করেছে। যারা এই আকিদা পোষণ করেছেন, তাদের ভ্রান্তি সম্পর্কে বেশি কিছু বলার আছে বলে মনে করি না। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের একটা শিশুও এই ভ্রান্ত আকিদা সম্পর্কে সচেতন। সে জানে, আল্লাহর জন্য সৃষ্টির কোন গুণ সাব্যস্ত করা কুফুরী। সেটা বসার আকিদা হোক, শোয়া বা দাড়ানোর আকিদা হোক না কেন। হাটা, চলা, বসা, দাড়ানো, শোয়া, এগুলো সব সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সব গুণ থেকে পবিত্র। তার গুণের সাথে তুলনীয় কিছুই নেই।  

আল্লাহর বসার বিষয়ে আমরা সর্বপ্রথম ইহুদীদের আকিদা উল্লেখ করবো। এরপর কাররামিয়াদের আকিদা। সব শেষে সালাফী আলেমদের বক্তব্য। 

আরশে বসার ব্যাপারে ইহুদী আকিদা

অল্ড টেস্টামেন্টের ফাস্ট কিং বইয়ে রয়েছে, 

And Micaiah said, “Therefore hear the word of the LORD: I saw the LORD sitting on his throne, and all the host of heaven standing beside him on his right hand and on his left;

অর্থাৎ সুতরাং প্রভূর বাণী শোনো। আমি প্রভূকে তার কুরসীর উপর বসা দেখলাম এবং আসমানের সকল সৈন্য তার ডান ও বাম পাশে দাড়ানো ছিলো। 

[ অল্ড টেস্টামেন্ট, দি বুক অফ ফাস্ট কিং, পরিচ্ছেদ ২২, শ্লোক, ১৯]

অনলাইন ভার্সন:

http://biblehub.com/1_kings/22-19.htm

অল্ড টেস্টামেন্টের দি বুক অব সামে রয়েছে,

 you have sat on the throne, giving righteous judgment.

অর্থ: আপনি ন্যায়-পরায়ণ হিসেবে কুরসীতে উপবেশন করেছেন। [বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ,৯, শ্লোক, ৪।]

অল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব সামে রয়েছে,

God reigns over the nations; God sits on his holy throne.

অর্থ: প্রভূ জাতিসমূহের উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন, প্রভূ তার পবিত্র কুরসীতে বসলেন। 

 [ বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ, ৪৭, শ্লোক, ৮]

অনলাইন ভার্সন:

http://biblehub.com/psalms/47-8.htm

বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে রয়েছে, 

and crying out with a loud voice, “Salvation belongs to our God who sits on the throne

অর্থাৎ উচু স্বরে চিৎকার করে কেদে উঠলো এবং বলল, আমাদের প্রভূর জন্য মুক্তি, যিনি তার কুরসীতে বসে আছেন। 

[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৭, শ্লোক, ১০]

অনলাইন ভার্সন:

http://biblehub.com/revelation/7-10.htm

একই পরিচ্ছেদের ১৫ নং শ্লোকে রয়েছে, 

“That is why they stand in front of God’s throne and serve him day and night in his Temple. And he who sits on the throne will give them shelter.

অথাৎ আরশে উপবেশনকারী তাদেরকে আশ্রয় দিবে। 

[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৭, শ্লোক, ১৫]

অনলাইন ভার্সন, 

http://biblehub.com/revelation/7-15.htm

একই বইয়ের ৪ নং পরিচ্ছেদে রয়েছে, 

And when those beasts give glory and honour and thanks to him that sat on the throne, who liveth for ever and ever

অর্থাৎ তারা সেই সত্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো যিনি আরশে বসে আছেন, যিনি চিরণ্জীব। 

[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৪, শ্লোক, ৯]

http://biblehub.com/revelation/4-9.htm

কাররামিয়াদের আকিদা: 

১. মুহাম্মাদ ইবনে কাররামের একটি মৌলিক ভ্রান্ত আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা দেহ ও শরীর বিশিষ্ট। তার দেহের একটি সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে। তার মতে আল্লাহর দেহের নিচের দিকের কেবল সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে, যেই দিক আরশের সাথে সংশ্লিষ্ট। 

২. ইবনে কাররামের আরেকটি আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপরের অংশ স্পর্শ করে আছেন। 

৩. ইবনে কাররামের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর স্থির হয়ে আছেন। সত্ত্বাগতভাবে তিনি উপরের দিকে রয়েছেন। আরশ হলো আল্লাহর অবস্থানের স্থান। 

বিস্তারিত দেখুন, 

আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৩, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮,  ই’তেকাদু ফিরাকিল মুসলিমিন, পৃ.১৭, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৪, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮।

সালাফী আকিদা: 

সালাফীদের অন্যতম শায়খ হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদী। তিনি বেশ কিছু কিতাব লিখেছেন। এসব কিতাবের অন্যতম একটি কিতাব হলো কিতাবুত তাউহীদ। কিতাবুত তাউহীদের একটি ব্যাখ্যা লিখেছে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদীর নাতী শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে হাসান। তিনি কিতাবুত তাউহীদের এ ব্যাখ্যার নাম দিয়েছেন ফাতহুল মাজীদ। ফাতহুলী মাজীদ কিতাবুত তাউহীদের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এটি তাহকীক করে প্রকাশ করেছেন, শায়খ আব্দুল কাদের আর-নাউত।  ফাতহুল মাজীদের ৪৮৫ পৃষ্ঠায় আল্লাহর আরশে বসার কথা রয়েছে।  এখানে রয়েছে, 

إذا جلس الرب علي الكرسي

“যখন প্রভূ কুরসীর উপর বসলেন”।  

নীচের স্ক্রিনশটের চিহৃিত অংশ দ্রষ্টব্য:

একটি ভিত্তিহীন বর্ণনার মাধ্যমে এভাবে সালাফীদের আকিদার কিতাবে আল্লাহর কুরসীতে বসার ঘৃণ্য আকিদা বর্ণনা করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো সালাফী শায়খ আব্দুল কাদের আর নাউত এই ভ্রান্ত আকিদা সম্পর্কে কোন মন্তব্যই করেননি। এ ব্যাপারে কোন অভিযোগও আনেননি। অথচ তিনি কিতাবটি তাহকীক করেছেন। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, এসব ভ্রান্ত আকিদার সাথে তিনিও একমত। নাউযুবিল্লাহ। 

২. সউদি সরকারের সাবেক প্রধান মুফতী সালাফীদের অন্যতম শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শায়খও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আল্লাহর আরশে বসার আকিদা বর্ণনা করেছেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে মাকামে মাহমুদ বা প্রশংসনীয় মর্যাদা দ্বারা সম্মানিত করবেন। মাকামে মাহমুদ এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত দিবসে রাসূল স. কে শাফায়াতে উজমা বা সবচেয়ে বড় শাফায়াতের ক্ষমতা দান করবেন।  শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহীম আলুশ শায়খ “মাকামে মাহমুদের” ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, 

” কেউ কেউ বলেছেন, মাকামে মাহমুদ হলো, ব্যাপক শাফায়াত বা সুপারিশ। কেউ কেউ বলেছেন, মাকামে মাহমুদ হলো, আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে আরশের উপরে তার পাশে বসাবেন। এটি আহলে সুন্নতের প্রসিদ্ধ বক্তব্য” উভয় বক্তব্যের মাঝে কোন বৈপরীত্ব নেই।  উভয়ের মাঝে এভাবে সমন্বয় করা সম্ভব যে উভয়টি রাসূল স. কে দেয়া হবে। তবে আল্লাহর পাশে রাসূল স. কে বসানো হবে, এই ব্যাখ্যাটি অধিক যুক্তিসঙ্গত।

[ফতোয়া ও রসাইল, পৃ.১৩৬। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শায়খ, তাহকীক মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম ইবনে কাসেম, প্রথম প্রকাশ, ১৩৯৯ হি:, মাতবায়াতুল হুকুমিয়া, মক্কা]

নীচের স্ক্রিনশটের চিহৃিত অংশ দ্রষ্টব্য:

অর্থাৎ তথাকথিত সালাফীরা এভাবে স্রষ্টাকে সৃষ্টির স্তরে নামিয়েছে। রাসূল স. আরশে যদি আল্লাহর পাশে বসেন, তাহলে আল্লাহ ও রাসূল স. এর মাঝে পার্থক্য কোথায়? কীসের ভিত্তিতে তারা আল্লাহকে রাসূল স. থেকে পৃথক করবে? উভয়ের গুণ যদি একই হয়, তাহলে স্রষ্টাকে কীসের ভিত্তিতে স্রষ্টা বলা হবে? অনেক সালাফী হয়তো বলবে, আল্রাহ তার শান অনুযায়ী রাসূল স. কে তার পাশে বসাবেন। আমরা বলবো, তাহলে হিন্দুদের অপরাধ কী? তাদের দেবতার ধারণার ক্ষেত্রেও তারা বলবে, স্রষ্টা তার শান অনুযায়ী সব কিছুর মাঝেই আছেন। এভাবে পৃথিবীর এমন কোন বাতিল আকিদা নেই, যা এই কথা দ্বারা প্রমাণ করা যায় না। আল্লাহর শানের খেলাফ কোন বিষয় আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করে, তার শান প্রমাণের চেষ্টা চরম গোমরাহী। যে সব বিষয় থেকে তিনি সম্পূর্ণ, সেসব বিষয় থেকে তার পবিত্রতা ঘোষনাই হলো তার শান। কোন ভালো মানুষকে চোর সাব্যস্ত একথা বলা যে, তার শান অনুযায়ী চোর, আর আল্লাহর জন্য মাখলুকের গুণ সাব্যস্ত করে তার শান অনুযায়ী বলা একই কথা। কাউকে যদি ভালো মানুষ বলেন, তাহলে সে চোর নয় এটাই তার শান। সে যদি চোর হয়, তাহলে সে ভালো মানুষ নয়।  শান অনুযায়ী শব্দ যোগ করলেও চোর হবে, না করলেও চোর হবে। একইভাবে আল্লাহ তায়ালাকে মাখলুকের সমস্ত গুণ থেকে পবিত্র বিশ্বাস করতে হবে। এখন যদি মাখলুকের গুণ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা আল্লাহ থাকবেন না। মাখলুকের স্তরে নেমে যাবেন। এটাকে আপনি শান অনুযায়ী বলেন বা অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করেন না কেন।  

এভাবে সালাফী আকিদা মূলত: মানুষকে আল্লাহর বসার আকিদার দাওয়াত দিয়েছে। আর এধরনের কুফুরী আকিদার দিকে দাওয়াত দেওয়ার পরেও সালাফীরা কীভাবে হকের পথে থাকে?

৩. সালাফীদের বিখ্যাত একজন শায়খ হলেন সালেহ আল-উসাইমিন। শায়খ সালেহ আল-উসাইমিনের উস্তাদ হলেন, আব্দুর রহমান সা’দী। তিনিও আরব সালাফীদের মাঝে বেশ পরিচিত। আব্দুর রহমান সা’দীও আরশে বসার আকিদা পোষণ করেন। তিনি লিখেছেন, 

” ইস্তেওয়ার একটি ব্যাখ্যা হলো, স্থির হওয়া বা বসা। এই ব্যাখ্যাটি সালাফ বা পূর্ববর্তীদের থেকে বর্ণিত”

[আল-আজইবাতুস সা’দিয়া আনিল মাসাইলিল কুয়েতিয়্যা, পৃ.১৪৭। তাহকীক, ড. ওলীদ আব্দুল্লাহ। ]

নীচের রেখাংকিত অংশ দ্রষ্টব্য: 

আব্দুর রহমান সা’দী সাহেব বলেছেন, আল্লাহর আরশে বসার ব্যাখ্যাটি সালাফ বা পূর্ববর্তীদের থেকে বর্ণিত। পূর্ববর্তী দ্বারা তিনি যদি ইহুদী ও কাররামিয়াদের উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে। ইহুদী কাররামিয়ারা এই নিৃকষ্ট আকিদা পোষণ করে থাকে। তিনি যদি সালাফ বলতে ইসলামের নেককার সালাফে সালেহীনকে উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন, তাহলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। সাধারণ সালাফীরা তাদের পূর্ববতী বলতে তাদের অনুসরণীয় কাররামিয়া ও মুজাসসিমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সালাফ বলতে ইবনে তাইমিয়া (মৃত: ৭২৮ হি:) ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়ূমকে উদ্দেশ্য নেয়। কারণ বর্তমান সালাফীদের মূল অনুসরণীয় হলো, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম। আর ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়ূম মূলত: কাররামিয়াদের ঘোর অনুসারী ছিলো। এদের আকিদা মূলত: মুশাববিহা, মুজাসসিমা ও কাররামিয়াদের আকিদা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

৪. বর্তমান সালাফীদের বিখ্যাত শায়খ হলেন সালেহ আল-উসাইমিন। তিনিওএই ইহুদীবাদী আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহর আরশে বসার আকিদাটি তিনিও স্বীকৃতি দিয়েছেন। শায়খ সালেহ আল-উসাইমিন তার মাজমুউল ফতোয়ায় ইবনুল কাইয়্যিম এর বক্তব্য এনেছেন। ইবনে তাইমিয়ার বিখ্যাত ছাত্র ইবনুল কাইয়্যূমও আরশে বসার আকিদা রাখতো। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান লিখেছেন, 

” ইস্তাওয়া শব্দের আরেকটি  ব্যাখ্যা  হলো, বসা। ইবনুল কাইয়্যিম আস-সাওয়াইকুল মুরসালা (খ.৪, পৃ.১৩০৩) কিতাবে এই ব্যাখ্যাটি খারিজা ইবনে মুসআব থেকে বর্ণনা করেছেন। সূরা ত্বহার ৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লিখেছেন, বসা ছাড়া কখনও কি ইস্তাওয়া হয়?

[মাজমুউ ফাতাওয়া ও রসাইল, ইবনে উসাইমিন, খ.১, পৃ.১৩৫, দারুল ওযাতন]

স্ক্রিনশটের চিহৃিত অংশ দ্রষ্টব্য:

৫. সালাফীদের অন্যতম বিখ্যাত শায়খ হলেন শায়খ সালেহ আল-ফাউজান। তিনি আব্দুল আজীজ বিন ফয়সাল আর-রাজেহীর একটি কিতাবের ভূমিকা লেখে দিয়েছে। কুদুমু কাতাইবিল জিহাদ নামক এই বইয়ে আব্দুল আজিজ রাজেহী আরশে বসার আকিদা সম্পর্কে লিখেছে, 

বসা ছাড়া কখনও কি ইস্তাওয়া হয়?  এই কথাটি সঠিক। এর উপর কোন ধুলোবালি নেই। অর্থাৎ এটি নি:সন্দেহে সঠিক।”

[কুদুমু কাতাইবিল জিহাদ, পৃ.১০১]

নীচের রেখাংকিত অংশ দ্রষ্টব্য:

৬. ইবনে তাইমিয়ার বিখ্যাত ছাত্র হলেন ইবনুল কাইয়্যিম। নাওনিয়াতু ইবনিল কাইয়্যিম নামে তার একটি কিতাব রয়েছে। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান ইবনুল কাইয়্যিমের এ কিতাবের উপর সংক্ষিপ্ত টীকা লিখেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, আত-তা’লিকুল মুখতাসার আলাল কাসিদাতিত নাউনিয়্যাহ। এ কিতাবে শায়খ ফাউজান আরশে বসার আকিদাটি স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন, 

” মাকামে মাহমুদ এর ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে আরশে নিজের পাশে বসাবেন।”

[আত-তালীকুল মুখতাসার, সালেহ আল-ফাউজান, পৃ.৪৫৩]

আন্ডারলাইন করা অংশ দ্রষ্টব্য:

 আশ্চর্যজনক স্ববিরোধীতা:

আকিদার ক্ষেত্রে সালাফী শায়খদের দোদুল্যমান অবস্থা দেখলে সত্যিই আশ্চর্য লাগে। এদের নির্দিষ্ট কোন দিক নেই। এখন পূর্বে থাকলে কিছুক্ষণ পরে ঠিকই পশ্চিমে যায়। এধরনের স্ববিরোধী অবস্থান বড় বিস্ময়কর। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় আল্লাহর বসার আকিদা স্বীকার করেছেন। যারা এটা অস্বীকার করে তাদেরকে দুর্বল মস্তিষ্কের আখ্যাযিত করেছেন। এমনকি তাদের কথা ধর্তব্য নয় বলেও রায় দিয়েছেন। অথচ তিনি আবার লিখেছেন, 

প্রশ্ন: শায়খ, আল্লাহ আপনাকে তৌফিক দান করুন। যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ইস্তাওয়া গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ তিনি আরশে বসেছেন, তার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? এটা কি তা’বীল বা ব্যাখ্যার অন্তুর্ভূক্ত হবে?

উত্তর: এটি বাতিল ও ভ্রান্ত। কেননা বসা দ্বারা ইস্তাওয়ার ব্যাখ্যা করা হয় না।আর আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বলি না।

[শরহু লুময়াতিল ই’তেকাদ, পৃ.৩০৫]

স্ক্রিনশট:

২. শায়খ ইবনে জিবরীন সালাফীদের অন্যতম শায়খ। তিনি আল-জওয়াবুল ফাইক ফির রদ্দি আলা মুবাদ্দিলিল হাকাইক নামে একটা পুস্তক লিখেছেন। এই পুস্তকে তিনি আল্লাহর বসার আকিদাটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। এমনকি যারা এ আকীদাকে আহলে সুন্নতের আকিদা বা নজদের ওহাবী বা সালাফী আলেমদের আকিদা বলে থাকে, তাদেরকে মিথ্যুক বলেছেন। তিনি লিখেছেন,

“সালাফে সালেহীনের কিতাবে ইস্তাওয়া শব্দের ব্যাখ্যায় বসার কোন অর্থ উল্লেখ নেই। সুতরাং আহলে সুন্নতের দিকে এই আকিদা সম্পৃক্ত করা কিংবা সালাফী আলেমদের দিকে এই আকিদা সম্পৃক্ত করা, তাদের সম্পর্কে মিথ্যাচার বৈ কিছুই নয়।“

স্ক্রিনশট: 

শায়খ আলবানীর বক্তব্য:

শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতে যেসব হাদীসে স্পষ্টভাবে আল্লাহর দিকে বসার কথা উল্লেখ রয়েছে এগুলো জাল হওয়া বান্ছনীয়। কেননা এসব হাদীসের বক্তব্য মুনকার। কেননা আল্লাহর আরশে বসার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই। আর বসার কথা যেসব হাদীসে রয়েছে, সেগুলো কখনও রাসূল স. এর হাদীস হতে পারে না। কারণ আল্লাহর দিকে বসার সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে যে এটি রাসূলস. এর হাদীস নয়। শায়খ আলবানীর সব লেখা সংকলন করে একটি মউসুয়া বের করা হয়েছে। এই মউসুয়ার প্রথম খন্ডে আকিদা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম খন্ডের ৩৪৩ পৃষ্ঠার শিরোনাম হলো,

“আল্লাহ তায়ালা জন্য বসার আকিদাটি ভিত্তিহীন”

এখানে শায়খ আলবানী বলেছেন,

“ আল্লাহর বসার ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই। সুতরাং আল্লাহর দিকে বসার আকিদা সম্বলিত হাদীস জাল হওয়াটাই বান্চনীয়”

নীচের রেখাংকিত অংশ দ্রষ্টব্য:

এছাড়া শায়খ আলবানী আরও স্পষ্টভাবে এই ভিত্তিহীন ভ্রান্ত আকিদাটি তার আল-মুখতাসারুল উলু কিতাবে খন্ডন করেছেন। তিনি লিখেছেন,

ولست ادري ما الذي منع المصنف – عفا الله عنه – من الاستقرار على هذه القول ، وعلى جزمه بان هذه الاثر منكر كما تقدم عنه ، فانه يتضمن نسبة القعود على العرش لله عزوجل ، وهذا يستلزم نسبة الاستقرار عليه لله تعالى وهذا مما لم يرد ، فلا يجوز اعتقاده ونسبته الى الله عزوجل

অর্থাৎ ইমাম যাহাবী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, আমি জানি না, লেখক (ইমাম যাহাবী) এই কথার উপর কেন অটল রইলেন না। এবং এই বর্ণনা মুনকার বা অবান্ছিত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় রইলেন না। কেননা, এ বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালার দিকে বসার কথা সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আরশে স্থির আছেন এটা সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহর বসার ব্যাপারে বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা নেই। সুতরাং এটি বিশ্বাস করা এবং তা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ হবে না।

[মুখতাসারুল উলু, পৃ.১৭, প্রথম সংস্করণ]

পরবতী আলোচনায় আরশে বসার ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য উল্লেখ করা হবে। এই বাতিল আকিদা শুধু উল্লেখিত শায়খরাই রাখে না, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয্যিমও রাখতো। এছাড়া তারা আরও কিছু জঘন্য বিষয় আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করেছে। পরবর্তী নোটে ইনশাআল্লাহ এগুলো আলোচনা করা হবে। 

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83