আক্বিদা

টি-টি-পি খারেজীদের অপরাধনামা (৪র্থ পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম বৃহঃ, 02 মার্চ, 2023
21

 

গত পর্বে আ-জ্জা-ম আল-আম-রিকি বলেছেন, চলমান জি-হা-দী গ্রুপগুলোর মাঝে অন্যায়ভাবে রক্তপাত, মানুষের রক্ত ও সম্পদ হালাল করার যেই জঘন্য দর্শন জেকে বসেছে, এ ব্যাপারে শক্ত কোন পদক্ষেপ কেন নেয়া হয় না? এর উত্তরে নেতৃস্থানীয় অনেকে বলে থাকেন, আমরা তো এগুলোর বিরোধিতা করি। সংশোধণের চেষ্টা করি। তিনি বলেন, এটা ঠিক যে আপনারে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অধিকাংশক্ষেত্রে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এসব দলের অনুসারীদের আত্মিক রুঢ়তা, গোঁড়ামী আর নির্বুদ্ধিতা এতো বেশি যে তারা অন্য কারও কথা নেয় না।

এরপর তিনি লিখেছেন,

" আমি বলব, আপনারা এসব হীন কাজ ও চিন্তা-চেতনার প্রতিকারে যা করেছেন বা এখনও করে যাচ্ছেন সেটি প্রশংসনীয়। তবে এই প্রতিবাদের ধরণ নিয়ে বিনয়ের সাথে আমিও আমার অভিমত তুলে ধরতে চাই। কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে আপনাদের এই প্রতিবাদ এসব জঘন্য কাজের তুলনায় সীমিত। আবার প্রতিবাদের ধরণ নিয়েও প্রশ্নের সুযোগ আছে। প্রতিবাদ ও নসীহতের ক্ষেত্রে আপনারা গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। আপনাদের ধারণা, এভাবে গোপনে নসীহত করার মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। প্রকাশ্য নসীহত বা প্রতিবাদ করলে এতে বড় ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। যেমন, বিভিন্ন জি-হা-দী সংগঠনের মাঝে মতবিরোধ ও ভাঙন সৃষ্টি হবে। আবার জি-হা-দী সংগঠনগুলোর দোষ-ত্রুটি প্রকাশ্যে এলে তাদের শত্রুরা সুযোগ পেয়ে যাবে। এগুলোর মাধ্যমে তারা সুযোগের সদ্বব্যহার করার চেষ্টা করতে পারে। এজাতীয় আরও কিছু যুক্তি দেখান হয়। যদিও এসব যুক্তির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ আছে।

প্রথমত: মু-জা-হিদ গ্রুপগুলোর মাঝে বিরোধ ও অনৈক্য সৃষ্টির যেই সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে, এটা নিছক একটা সম্ভাবনা। সত্য কথা হলো, যারা এসব জঘন্য কাজ করে যাচ্ছে, তাদের আসলে মু-জা-হি-দদের দলে থাকাই উচিৎ নয়। বরং এরা তো এক ধরণের জঞ্জাল, যা থেকে জি-হা-দী দলগুলো মুক্ত ও পবিত্র হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত: শত্রুদের সামনে এদের কর্মকান্ড প্রকাশ করলে তারা এগুলোর অপব্যবহারের যেই চিন্তা করা হচ্ছে, আল্লাহর শপথ করে বলছি; এরা এই সব হামলার মাধ্যমে যেই নিকৃষ্ট জুলুম করে যাচ্ছে এটি সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জঘন্য ও সবচয়ে নিকৃষ্ট দোষ। এসব হা-ম-লাকে উপলক্ষ্য বানিয়েই তো শত্রুতা অনেক বড় সুযোগ পেয়ে গেছে। এগুলো ব্যবহার করে তারা মুখলিস মু-জা-হিদদের বাস্তবতা ও চিত্র বিকৃত করার সুযোগ পেয়েছে। এমনকি অনেক সাধারণ ও বিশিষ্টজনের ধারণা হয়ে গেছে, মু-জা-হিদ হলো তারাই যারা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ছিনতাই করা, মসজিদে মসজিদে বো-মা-বাজি করা, নিজেদের সাথে শত্রুতা আছে এমন এক - দুইজনকে হ-ত্যা করার জন্য ডজন ডজন মানুষ হত্যা করা হলো যাদের মূল কাজ। সেই সাথে তারা আবার গান শোনা বা বেগানা নারীর দিকে তাকানকে বড় অপরাধ মনে করে। অথচ সাধারণ মানুষ এগুলোকে ওই মাপের বড় অপরাধ মনে করে না। তারা উপরের হত্যাযজ্ঞ ও রক্তপাতকে বড় মনে করে এবং এগুলোকে সেই তুলনায় ছোট মনে করে। কিন্তু জি-হা-দী হিসেবে পরিচিতরা এই সব বড় বড় জঘন্য কাজ করে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বিশাল বড় অপরাধ মনে না করা বিষয়গুলোকে তারা বড় মনে করে। আর এগুলোর মাধ্যমেই উলামায়ে কেরাম মসজিদের মেম্বার ও বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশ্যে একথা বলার সুযোগ পাচ্ছে যে, এসব জি-হা-দীরা হলো বর্তমানের হারুরিয়া খারেজী অথবা বর্তমানের কারামিতা। এর মাধ্যমে তারা বহু মুসলমানকে তাদের দাবীর ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ এসব জঘন্য কাজের একটা অংশের দায় আমাদের উপরও বর্তায়। কারণ, আমরা পরোক্ষভাবে এসব জঘন্য কাজের অংশীদার। এসব শরীয়াত বিরোধী হারাম কাজের ব্যাপারে আমরা আমাদের স্পষ্ট সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। একইভাবে আসল অপরাধীদেরকে আড়াল করার জন্য অনেক সময় আমরা তাদের উপর থেকে দায় সরিয়ে 'ব্লা-ক ওয়াটার' কে দায়ী করেছি।

আমি অবগত হয়েছি যে, শায়খ আ-তি-য়াতুল্লাহ আল-লি-বি সাধারণ জন-সমাগমে বো-মা-বাজি করার বিষয়ে একটি ফতোয়ার খসড়া তৈরি করেছিলেন। এবং এগুলো যে কিছু কিছু জি-হা-দী গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছে, তার সম্ভাবনা তুলে ধরে শক্ত প্রতিবাদও করেছেন। অথচ কিছু শায়খের পরামর্শে সেই ফতোয়া প্রকাশের আগে এ বিষয়গুলো মূল ফতোয়া থেকে বাদ দেয়া হয়। যাদের বক্তব্য ছিলো, এধরণের জঘন্য কাজ জি-হা-দী গ্রুপগুলো থেকে প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করা উচিৎ হবে না। অর্থাৎ এসব বিষয়ে আমরা প্রকাশ্যে সব-ধরণের নিরবতা অবলম্বন করে এগুলোকে গোপন করা আমাদের পদ্ধতি বানিয়েছে। অথচ এটি অনেকগুলো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ।

১। বিষয়গুলো দ্বীন ও ফতোয়ার বিষয়। এগুলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের অন্তর্ভূক্ত। এগুলো কোন জি-হা-দী সংগঠনের গোপন বিষয় নয় যে, এর ব্যাপারে চূড়ান্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হবে। মনে রাখতে হবে প্রয়োজনের সময় সত্যকে গোপন করা অথবা সত্য প্রকাশে বিলম্ব করার বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ শাস্তির হুশিয়ারী রয়েছে।

২। দ্বিতীয়ত: এসব বিষয় দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ও প্রকাশ্য। ছোট-বড়, সাধারণ-অসাধারণ কম-বেশি সবাই অবগত। এমন প্রকাশ্য বিষয়ে আমাদের নিরবতা মূলত: অন্য মানুষের বিবেক নিয়ে এক ধরণের তামাশা। সেই সাথে আমাদের নিজেদের প্রতিও অসম্মান। এর মাধ্যমে সর্ব-সাধারণের সামনে আমরা বোবা শয়তান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছি। আমাদের চারপাশে জঘন্য অন্যায় কাজ হচ্ছে অথচ আমরা নীরব বসে আছি। অথবা অনেক ক্ষেত্রে আমরা মুদাহিন হিসেবে কাজ করছি। এসব হত্যাকারী অপরাধীদেরকে সম্মান দিচ্ছি। এরা মারা গেলে তাদের ব্যাপারে শোক প্রকাশ করছি। আমরা তাদেরকে নেককার ও সৎ মানুষ হিসেবে প্রচার করছি যদিও আমরা জানি যে তারা কী পরিমাণ জঘন্য অপরাধে জড়িত। অথবা সাধারণ মানুষের সামনে আমরা এক ধরণের উদাসীন লোক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছি, যাদের আসে-পাশের কোন খোঁজ-খবর নেই।

সুতরাং এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদের পদ্ধতি ও গোপনীয়তার নীতির বিষয়ে ফিরে আসি। আমার বক্তব্য হলো, আমরা একটা প্রকাশ্য অপরাধের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হায়-লজ্জার মাথা খেয়ে প্রকাশ্যে তারা এসব জঘন্য অপকর্ম করে যাচ্ছে। আর এসব জঘন্য চিন্তা-দর্শন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জি-হা-দী গ্রুপগুলোর ভেতরে ঢুকে গেছে। আর একথা তো সর্বজন বিদিত যে, এমন অপরাধ যা খুল্লুম-খোলা সবার সামনে করা হয় তার প্রতিবাদের পদ্ধতি সবার চোখের আড়ালে গোপনে হওয়া অপরাধ থেকে নিশ্চয় ভিন্ন। গোপন অপরাধের ক্ষেত্রে শরীয়াতের বিধান হলো সেগুলো গোপন রাখা। প্রকাশ্যে না আনা। প্রকাশের পথ বন্ধ করা। যদিও এর ব্যতিক্রমও আছে। উল্টো দিকে প্রকাশ্য অপরাধের ক্ষেত্রে শরীয়াতের নীতিমালা হলো, এর প্রতিবাদ ও প্রতিকার প্রকাশ্যে হতে হবে। কারণ, প্রকাশ্য প্রতিবাদের মাধ্যমে অন্যরা সতর্ক হবে। যারা এসব অপরাধীদেরকে অনুসরণ করতে চেয়েছে কিংবা তাদের সহযোগী হওয়ার মনস্থ করেছে, তারাও সতর্ক হবে। এভাবে প্রকাশ্য প্রতিবাদের অনেক উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু দু:খজনক বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য অপরাধের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য প্রতিবাদকে আমরা অবহেলা করেছি। যার কারণে আমাদের প্রতিবাদ আসলে অপূর্ণাঙ্গ বা অসম্পূর্ণ। এটি শরয়ী সঠিক প্রতিবাদের শর্ত পূরণ করেনি।

আমরা অন্তত: নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক্ষেত্রে অনুসরণ করতে পারতাম। কারণ, খালিদ রাজিয়াল্লাহু আনহু সন্দেহের বশে একজন মুসলিমকে হত্যা করায় নবীজী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে তিনবার বলেছেন, হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে তার থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। আর তিনি এটি ঘোষণা দিয়ে করেছেন। যার কারণে আজ চৌদ্দ শ' বছর পরেও তার সেই বক্তব্য জানতে পারছি। বিষয়টি নিয়ে আশা করি চিন্তা করবেন। "

এরপর আ-জ্জা-ম আল-আ-মরিকি প্রকাশ্য প্রতিবাদের কিছু রুপরেখা নিয়ে কথা বলেছেন। নিজেও একটি ঘোষণাপত্র লিখেছেন য়ে এমন প্রতিবাদ হতে পারে। মোটকথা, একদল জি-হা-দের নামে ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য কাজগুলো করে যাচ্ছে, অন্যরা সেগুলোর প্রতিবাদ বা ন্যুনত শরয়ী দায়িত্ব পালন না করে বোবা শয়তানের ভূমিকা পালন করছে। যা খুবই দু:খজনক। এক দিকে খারেজীরা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে এগুলোকে জি-হা-দ নাম দিয়ে উল্লাস করছে, অন্য দিকে এগুলোর সঠিক প্রতিবাদ না হওয়াই সবার পক্ষ থেকে তাদের এহেন জঘন্য পাপাচারের সার্টিফিকেটও দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা এরকম বোবা শয়তানের ভূমিকা পালন করা থেকে উম্মতের উলামা-তুলাবা ও মাশাইখদেরকে হেফাজত করুন।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 684
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83