ইখতিলাফ কি শুধু ফুকাহাদের মাঝেই ছিলো?

মোবারক হুসাইন বৃহঃ, 02 ডিসে., 2021
21

আমাদের অনেক ভাই মনে করেন,সব ইখতিলাফ শুধু ফুকাহাদের মাঝেই, মুহাদ্দিসগণের মাঝে কোন ইখতিলাফ নেই।উপরন্তু তারা এই ইখতিলাফকে খুবই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে থাকেন।অনেকের কথায় এমন ভাবও ফুটে উঠে যে,এই ফিকহী ইখতিলাফই উম্মাহর বিভক্তির কারণ!
ড. বিলাল ফিলিপস তার বই 'Evolution of the madh-habs' যা সিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে 'মাযহাবঃ অতিত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ' নামে অনূদিত হয়েছে,তাতে মাযহাব মানা ও না মানা উভয় সিদ্ধান্তকে প্রান্তিক বলে দাবি করে মাযহাব মানা লোকদের সম্পর্কে বলেন,

'এই উভয় সিদ্ধান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত।দ্বিতীয় মতের অনুসারীগণ এই মাযহাবকেন্দ্রিক মতপার্থক্যকে এক ধরণের স্থায়ী রূপ দান করেছেন।এসব দৃষ্টিভঙ্গি অতিতেও মুসলমানদের বিভক্ত করেছে এবং বর্তমানেও করে চলছে।' {পৃ:২০}

এখানে 'বিভক্তি' বলে লেখক ঠিক কোন ধরণের বিভক্তি বুঝিয়েছেন তা লেখকই জানেন।অন্যথায় পুরো ইসলামের ইতিহাসে স্রেফ মাযহাবকে কেন্দ্র করে উম্মাহর মাঝে ফাটল কিংবা অনৈক্য দেখা দিয়েছে,এরকম নজির কেউ দেখাতে পারবেনা।হ্যা নিতান্ত বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাক্তি বিশেষের বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন দেখা গিয়েছে,নয়তো يَكونُ في أمَّتي رجلٌ يُقالُ لَهُ : ابنُ إدريسَ أضرُّ على أمَّتي مِن إبليسَ ورجلٌ يُقالُ لَهُ أبو حَنيفةَ هوَ سراجُ أمَّتي -এধরণের জাল বর্ণনা তৈরি হয়েছে কিভাবে?
কিন্তু মেজরিটি মু'তাদিল লোকেদের থাকায় এরা বিশেষ পাত্তা পায়নি।ফলে সময়ের সাথে সাথে এরাও হারিয়ে গেছে।

এই লেখায় আমরা দেখানোর চেষ্টা করবো,ইখতিলাফ শুধু ফুকাহাদের মাঝে ছিলোনা,বরং মুহাদ্দিসগণের মাঝেও অনেক মতানৈক্য ছিলো।কোন রাবীকে একজন মুহাদ্দিস নিজের ইজতিহাদ অনুযায়ী ছিকাহ বলেছেন তো আরেকজন বলেছেন যয়িফ।তাইতো আমরা দেখতে পাই জাবের আল-জু'ফীর ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা রহঃ বলছেন,ما رأيت أكذب من جابر الجعفي কিন্তু শুবা রহঃ তার থেকে রেওয়ায়েত নিচ্ছেন।মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের ব্যাপারে একদিকে ইমাম মালেক বলছেন,
دجال من الدجاجلة، نحن أخرجناه من المدينة
অপরদিকে শুবা রহঃ "أمير المؤمنين في الحديث" বলছেন। ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে তার বক্তব্য নিয়ে আসছেন!
কোন হাদিসকে এক মুহাদ্দিস নিজের ইজতিহাদ অনুযায়ী তাসহীহ করেছেন তো অন্যরা তাযয়িফ করেছেন।এর অসংখ্য নজির তো আমাদের সবার সামনেই আছে।

এবার চলুন মুহাদ্দিসগণের মাঝে থাকা কিছু মৌলিক ইখতিলাফের নমুনা দেখে নেয়া যাক—

আমরা জানি, কোন হাদিস সহীহ হতে হলে তাতে পাঁচটি শর্তের উপস্থিতি জরুরি-

১. اتصال السند বা অবিচ্ছিন্ন সূত্র।
২. عدالة الراوي বা বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা।
৩. ضبط الراي বা বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি।
৪. السلامة من الشذوذ বা সনদ ও মতন বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত হওয়া।
৫. السلامة من العلة القادحة বা সুক্ষ্ম ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া।

এখন আমরা এই সবগুলো শর্তের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের কিছু ইখতিলাফের নমুনা তুলে ধরবো—

• ইত্তিসাল বা অবিচ্ছিন্ন সূত্রের শর্তটি প্রমাণিত হওয়ার
ক্ষেত্রে খোদ ইমাম বোখারী ও মুসলিমের মাঝেই বিশাল মতানৈক্য রয়েছে।যা 'مسئلة اللقاء' হিসেবে প্রসিদ্ধ।এমনকি এই মতানৈক্যের জের ধরে ইমাম মুসলিম তার সহিহ মুসলিমের মুকাদ্দিমায় ইমাম বুখারী ও এই মতের প্রবক্তা অন্যান্য মুহাদ্দিসগণকে 'بعض منتحلي الحديث' বলেছেন।কওমী মাদ্রাসায় দাওরা পড়া ছাত্র মানেই জানেন কত কঠিন শব্দপ্রয়োগ এটি।

তো ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ হাদিসের সনদে উল্লেখিত শায়খ ও ছাত্রের মাঝে একবার হলেও সাক্ষাৎ প্রমাণিত থাকার শর্ত আরোপ করেন।অপরদিকে ইমাম মুসলিম ও আরো কিছু লোকেরা শুধুমাত্র সাক্ষাতের সম্ভাবনাকেই যথেষ্ট মনে করেন।এমনকি মুসলিম রহঃ তাঁর এই মতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের ইজমা থাকার কথাও দাবি করেছেন।

চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই অনুভব করতে পারছেন,এই একটি মূলনীতিগত ইখতিলাফের কারনে কি পরিমাণ শাখাগত মাসআলায় মতানৈক্য তৈরি হবে।ইমাম মুসলিম ও তাঁর মতের প্রবক্তাগণ এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে যে সকল হাদিসকে সহিহ বলবেন ও তা থেকে মাসআলা আহরণ করবেন; এসবকিছু ইমাম বুখারী ও তাঁর অনুসারীদের নিকট দূর্বল।এগুলো থেকে আহরণ করা মাসআলাও অগ্রহণযোগ্য।

ইত্তিসালের মাসআলায় ইখতিলাফের আরো বড় ক্ষেত্র হচ্ছে,হাদিসে মুরসাল যা কোন তাবেয়ী সাহাবীর মধ্যস্থতা ছাড়া সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেন।

→অধিকাংশ মুহাদ্দিসিনে কেরামগণের নিকট হাদিসে মুরসাল জয়িফ।

→অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরাম (যাদের মাঝে ইমাম আবু হানীফা,ইমাম মালেক ও আহমাদ রহঃ ও এক মতানুযায়ী আছেন)এর মতে তা সহিহ ও দলিলযোগ্য।

→ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর নিকট শর্ত সাপেক্ষে তা দলিলযোগ্য হতে পারে।

এখন ইমাম শাফেয়ী রহঃ কতৃক আরোপিত শর্ত পাওয়া যায়নি,এমন হাদিস দ্বারা অন্যান্য ফকিহগণ যদি কোন মাসআলা ইস্তিম্বাত করেন; তবে স্পষ্টতই ইমাম শাফেয়ী ও মুহাদ্দিসিনে কেরাম তার বিপরিতে অবস্থান নিবেন।

• রাবীর বিশ্বস্ততার জায়গাতেও ইখতিলাফের বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে।কোন্ ধরণের বিশ্বস্ততা এখানে গ্রহণযোগ্য এটা নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে।
→রাবী এমন মুসলিম হওয়াই কি যথেষ্ট যার ব্যাপারে কোন জরাহ প্রমাণিত নেই?

→নাকি এর পাশাপাশি বাহ্যিক ন্যায়পরায়ণতাও লাগবে?

→শুধু বাহ্যিক ন্যায়পরায়ণতাই চলবে? নাকি এর সাথে সাথে আভ্যন্তরীণ ন্যায়পরায়ণতাও থাকতে হবে?

→এরপর শুধু একজন ইমাম কতৃক রাবীর ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষি দেয়াই যথেষ্ট? দুজন লাগবে?

→এগুলোর পাশাপাশি কোন্ কোন্ বিষয় রাবীর বিশ্বস্ততাকে নষ্ট করে দেয়?কোনগুলো দেয়না?
এখানেও মতান্তরের বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে।কত রাবীকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে শুধুমাত্র 'ইরাকী' হওয়ার কারনে জরাহ করা হয়েছে! কত রাবীর 'আদালাত'(বিশ্বস্ততা) বিলোপ করা হয়েছে 'আহলুর রায়' হওয়ার অপরাধে(?) কত রাবীকে 'খালকে কুরআন'এর মাসআলায় মুখ খোলার কারণে যিন্দিক কিংবা বিদআতি বলে দেয়া হয়েছে! খোদ ইমাম বুখারী যার শিকার হয়েছিলেন নিজ উস্তায যুহলীর পক্ষ থেকে।
তাই শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা হাফিযাহুল্লাহ বলেন,জরাহ তা'দিলের 'ইতিহাস' ও এর 'আভ্যন্তরীণ বিষয়াদি' জানা এবং এর 'ফিকহ' অর্জন ছাড়া এগুলো থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।

• রাবীর স্মৃতিশক্তি প্রমাণের জায়গাতেও যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মতে রাবী তার শায়খ থেকে হাদিস গ্রহণের পর থেকে নিজের ছাত্রদের শেখানোর আগপর্যন্ত পুরো সময় ধরে হাদিসটিকে তার মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করতে হবে।কিছু সময়ের জন্যেও ভুলে যাওয়া চলবেনা।এমনকি ব্যাক্তিগত নোট খাতা দেখেও যদি হাদিস বর্ণনা করতে যায়, তবু্ও যতক্ষণ না পর্যন্ত এব্যাপারে নিশ্চিত হবে যে, এটা তার নিজের লেখা ততক্ষণ সেটা বর্ণনা করতে পারবেনা।অর্থাৎ শুধু নিজের খাতায় নিজের লেখার মতো লেখা দেখেই বর্ণনা করতে পারবেনা, যদি না নিজে সেটা লেখার কথা মনে থাকে।

• 'সনদ ও মতন বিচ্ছিন্নতা ও সুক্ষ্ম ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া' এখানে যে আরো বিশাল মতপার্থক্যের সুযোগ রয়েছে ইলালের কিতাবগুলোই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এখানে রয়েছে মুহাদ্দিসের 'যাওক' বা শাস্ত্রীয় রুচির প্রভাব।এমনকি অনেক বিষয় এমন রয়েছে যেগুলো কোন মুহাদ্দিস স্রেফ নিজে অনুভব করতে পারেন কিন্তু কথায় ব্যাক্ত করার মতো ভাষা পাননা।বলা যেতে পারে অনেকটা জহুরীর মতো।অনেক সময় জহুরীকে স্বর্ণের মতো দেখতে কোন ধাতু দেয়ার পর সে এটাকে দেখেই ভেজাল ধরে ফেলতে পারে কিন্তু তার কাছে যদি এর প্রমাণ চাওয়া হয় সে কোন প্রমাণ দেখাতে পারবেনা।অথচ তার মন্তব্য পুরোপুরি নির্ভুল।
তাইতো আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১হিঃ) বলেন,
ربما تقصر عبارة المعلل عن إقامة الحجة على دعواه، كالصيرفي في نقد الدينار والدرهم
তারীবুর রাবী (পৃঃ১৬১-১৬২)

মাওলানা আব্দুল মালেক (হাফিযাহুল্লাহ)র এই কথাটা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক—
بل قرائن خصوص المقام وشواهد الحال وشهادة الوجدان قد تحكم على القواعد فتجعلها أكثرية أو أدنى من ذلك، وأصحاب البصيرة النافذة من أئمة الحديث والمجتهدين ليسوا بمتقيدين تقيدا حرفيا بالقواعد التي صاغ عباراتها المحدثون المتأخرون في كتب المصطلح، بل جل تلك القواعد مما استبط بالنظر في صنيع الأئمة وأحكامهم على الرواة

المدخل إلى علوم الحديث الشريف (পৃঃ ১৬৭)
(সুবহানাল্লাহ! স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো কথা।)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে,মুহাদ্দিসিনে কেরামগণের মাঝেও যথেষ্ট পরিমাণে ইখতিলাফ ছিলো,এবং ক্ষেত্রবিশেষে এগুলোকে কেন্দ্র করে তাঁরা একজন আরেকজনের ব্যাপারে কঠিন কঠিন শব্দও প্রয়োগ করেছিলেন।কিন্তু ফিকহ যেহেতু হাদিসের প্রায়োগিক দিকের সাথে সম্পর্কিত তাই এখানকার ইখতিলাফটা বড় করে চোখে পড়েছে।অপরদিকে হাদিসের ইখতিলাফ স্রেফ তাত্ত্বিকতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

করোনা ভাইরাস, ছোঁয়াছে রোগ, তাওয়াক্কুল ও অন্যান্য

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 16

"লা আদরী" বলতে পারা ইলমের অর্ধেক

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 49

হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রহঃ-র মূলনীতি বোখারী-মুসলিমের চাইতেও শক্তিশা…

মোবারক হুসাইন · 02 ডিসে., 2021 · 21