ঈমান-আক্বিদা

ভ্রান্তির বেড়াজালে সালাফী আক্বিদা (পর্ব-২)

ইজহারুল ইসলাম রবি, 12 সেপ্টে., 2021
21

উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমী রহ: (মৃত:২৮০ হি:)

শুরুতেই একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি রহ: এবং সুনানে দারিমি এর লেখক একই ব্যক্তি নন। সুনানে দারিমির লেখকের নাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান। তিনি ২৫৫ হি: মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি মৃত্যু বরণ করেন ২৮০ হি:।


তার জীবনী গ্রন্থসমূহে তার রচিত দু’টি আক্বিদার কিতাবের নাম পাওয়া যায়।

১. আর রদ্দু আলাল-জাহমিয়া।

২. আর-রদ্দু আলাল বিশর আল-মারিসি।

সালাফীরা উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমীকে তাদের প্রথম শ্রেণির আক্বিদার ইমাম মনে করে এবং তার এই কিতাব দু’টিকে তাদের আক্বিদার কিতাব সমূহের মৌলিক কিতাব হিসেবে গন্য করে।

আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া কিতাবটি শায়খ বদর আল-বদর ১৯৮৫ সালে আদ-দারুস সালাফিয়্যা থেকে তাহকীকসহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে শায়খ যুহাইর আশ-শাবিশ আল-মাকতাবুল ইসলামী থেকে এটি প্রকাশ করেন। সউদী আরবের উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটির ছাত্র মাহমুদ মুহাম্মাদ আবু রহীম ১৯৮৩ সালে উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির আক্বিদা বিশ্লেষণ করে একটি উচ্চতর গবেষণাপত্র লেখেন। এই থিসিসের উপর তিনি উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। তার থিসিসের নাম হলো, আল-ইমাম উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি ও দিফাউহু আন আক্বিদাতিস সালাফ অর্থাৎ ইমাম উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি ও সালাফে-সালেহীনের আক্বিদা সংরক্ষণে তার পদক্ষেপ। বর্তমান সালাফীদের কাছে উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির এই দুটি কিতাব এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে এর উপর সউদী শেইখরা নিয়মিত দরস দিয়েছেন। সালাফী শায়খ ড. আব্দুল্লাহ গুনাইমান ২০১০ সালে এই কিতাবের উপর দরস দিয়েছেন। [১]

সালাফীদের আরেক শায়খ ফয়সাল বিন কাযযার আল-জাসিম ২০০৬ সালে আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া কিতাবের উপর দরস প্রদান করেছেন। [২]


উসমান ইবনে সাউদ আদ-দারিমির দ্বিতীয় আর-রদ্দু আলাল মারিসিও সালাফীদের নিকট খুবই গুরুত্ব। এটি তাদের মৌলিক আক্বিদার কিতাবের অন্যতম কিতাব।

ড. আলী সামী আন-নাশশার এটি তাহকীক করে প্রকাশ করেন। সালাফীরা শুধু তার তাহকীকের উপরই সন্তুষ্টি হয়নি পরবর্তীতে আনসারুস সুন্নাতিল মুহাম্মাদিয়া এর প্রধান শায়খ হামেদ ফকী এই কিতাবটি তাহকীক করে প্রকাশ করেন। সালাফীদের কাছে কিতাবটি এতো গুরুত্বপূর্ণ যে পূর্বোক্ত দু’জনের তাহকীকে তারা সীমাবদ্ধ থাকেনি, পরবর্তীতে মুহাম্মাদ বিন সউদ ইউনিভার্সিটি থেকে ড. রশীদ বিন হাসান আল-মায়ী এটি তাহকীক করে মুমতাজ নাম্বার পেয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এই কিতাবে ভূমিকা লেখে দিয়েছে সালাফী শায়খ আব্দুল আজীজ বিন আব্দুল্লাহ আর-রাজিহি। মোট কথা উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির এই কিতাব দু’টি সালাফী আক্বিদার মৌলিক কিতাব এবং এগুলো তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূণ। কিতাব দু’টির গুরুত্ব সম্পর্কে সালাফী আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো,

সালাফী শায়খদের নিকট দারিরিম কিতাবের গুরুত্ব:

সালাফী শায়খ আব্দুল আজীজ বিন আব্দুল্লাহ আর-রাজিহি বলেন,
يعتبر هذا الكتاب بأجزائه الثلاثة من أهم الكتب المصنفة في العقيدة علي مذهب أهل السنة و الجماعة
অর্থ: উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির আর-রদ্দু আলাল মারিসি (৩ খন্ড বিশিষ্ট) কিতাবটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বিদার উপর লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কিতাব। [৩]


এখানে আহলুস সুন্নাহ দ্বারা তথাকথিত সালাফী আক্বিদা উদ্দেশ্য। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, বর্তমানের সালাফী আক্বিদা মূলত: কাররামিয়াদের আক্বিদা নতুন নামে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাহ এর দিকে সম্পৃক্ত করলেও আহলুস সুন্নাহ এর সাথে তাদের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই।


তিনি পরবর্তীতে উসমান ইবেন সাইদ এর কিতাব দু’টি সম্পর্কে বলেন,
وقد أثني العلماء علي هذين الكتابين ونقلوا عنهما و إستشهدوا بما فيهما ، كما قال العلامة إبن القيم الجوزية رحمه الله تعالي :
( كتابا الدارمي : النقض على بشر المريسي والرد على الجهمية – من أجل الكتب المصنفة في السنة وأنفعها وينبغي لكل طالب سنة , مراده الوقوف على ما كان عليه الصحابة والتابعين والأئمة أن يقرأ كتابيه . وكان شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله يوصي بهما أشد الوصية ، ويعظمها جدا ، وفيهما من تقرير التوحيد والأسماء والصفات بالعقل والنقل ما ليس في غيرهما )
و كان شيخ الإسلام إبن تيمية رحمه الله ينقل من هذا الكتاب الصفحات في مؤلفاته و ردوده كما في كتابه الذي لا نظير له في بابه : درء تعارض العقل و النقل و كما نقل عنه العلامة إبن القيم في كتابه: إجتماع الجيوش الإسلامية علي غزو المعطلة و الجهمية و كما نقل غيرهما من أهل العلم

অর্থ: আলেমগণ এই দুই কিতাবের ব্যাপারে খুবই প্রশংসা করেছেন। এখান থেকে তারা উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং এই কিতাবের আক্বিদা-বিশ্বাস সঠিক হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন। যেমন আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ.বলেন, “উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির কিতাব, আন-নকজু আলা বিশর আল-মারিসি ও আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া, আক্বিদা বিষয় লিখিত শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে উপকারী কিতাবের অন্যতম। আক্বিদা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী প্রত্যেক ছাত্র যে সাহাবা, তাবেয়ীন, ও তাবে-তাবেয়ীন ও ইমামদের আক্বিদা সম্পর্কে জানতে চায়, সে যেন এই কিতাব দু’টো পড়ে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এই কিতাব দু’টো পড়ার যারপর নাই গুরুত্বের সঙ্গে ওসিয়ত করতেন। তিনি কিতাব দু’টোকে খুবই সমাদর করতেন। কিতাব দু’টোতে আল্লাহর একত্বতা, নাম ও গুনাবলী বিভিন্ন বর্ণনা ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে, যা সাধারণত: অন্য কিতাবে পাওয়া যায় না। ”[৪]


শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এই কিতাব দু’টি থেকে তার রচনা ও জবাবমূলক বইগুলোতে ব্যাপক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন তার অনন্য কিতাব দরউ তায়ারুজিল আকলী ওয়ান নকল-এ তিনি এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। একইভাবে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তর ইজতেমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়া কিতাবে দারিমির এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য আলেমরাও এ কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।[৫]


সালাফী শায়খ ড.রশীদ বিন হাসান এই কিতাবের ছয়টি ইলমী গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন। এবং সর্বশেষ তিনি লিখেছেন, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এই কিতাবের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন এই কিতাবের ইলমী মর্যাদার জন্য সেটিই যথেষ্ট। এরপর তিনি ইবনুল কাইয়্যিম রহ. উপর্যুক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করেন।

তিনি লিখেছেন ইবনে তাইমিয়া রহ. তার দরউ তায়ারুজিল আকলী ওয়ান নকলি কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডে ৪৯-৬০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এবং ৬৬-৭৩ পর্যন্ত দারিমির এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। একইভাবে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার ইজতেমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়া কিতাবে ৮৯-৯০ পৃষ্ঠায় এই কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আব্দুল ওহাব নজদীর অনুসারী আলেমগণও এই কিতাব থেকে দলিল প্রদান করেছেন। যেমন আদ-দুরারুস সুন্নিয়া ফিল আজইবাতুন নজদিয়া কিতাবের তৃতীয় খন্ডে ১০৯-১১১ পৃষ্ঠায় এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। [৬]


একইভাবে সালাফী শায়খ হামিদ আল-ফকী ও শায়খ বদর আল-বদর এই কিতাবের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শায়খ ফয়সাল বিন কাজজার আল-জাসিম আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া সম্পর্কে বলেছেন,
وهذا الكتاب من الكتب الأصلية كما يقال أو من الكتب التي هي المرجع في بيان معتقد أئمة السنة من الصحابة رضي الله عنهم و التابعين و أتباعهم وهو كتاب نفيس
“দারিমির এই কিতাবটি আক্বিদার কিতাব সমূহের মাঝে মৌলিক কিতাব। অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমামগন তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের আক্বিদা বর্ণনায় এটিই মৌলিক উৎস। কিতাবটি খুবই মূল্যবান।[৭]


সউদী সরকারী মুফতী বোর্ড তথা আল-লাজনাতুত দাইমা লিল-বুহুসি ওয়াল ইফতার পক্ষ থেকে উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির এই কিতাবগুলোকে সীমাহীন গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তারা এই কিতাব সম্পর্কে বলেছেন,
فهذه الكتب هي الدواء الشافي والنور الهادئ في ظلم الجهل والشرك لما تشتمل عليه من الآيات القرآنية والأحاديث النبوية مثل كتاب التوحيد لابن خزيمة وكتاب السنة لعبد الله بن الإمام أحمد بن حنبل ورد عثمان بن سعيد الدارمي على الجهمية ومثل كتب شيخ الإسلام ابن تيمية والعلامة بن القيم والشيخ محمد بن عبد الوهاب وغيره من الدعاة إلى الحق من أهل السنة والجماعة.
অর্থ: “অজ্ঞতা ও শিরকের অন্ধকারে এই কিতাবগুলো আরোগ্যদানকারী ঔষধের ন্যায় এবং হেদায়াত দানকারী আলোর ন্যায়। এই কিতাবগুলোতে কুরআনের আয়াত ও হাদীস রয়েছে। যেমন, ইবনে খোজাইমা রহ. এর কিতাবুত তাউহীদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কিতাবুস সুন্নাহ, উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া। একইভাবে ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম ও শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীসহ হক্বের দিকে আহ্বানকারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আলেমদের কিতাব সমূহ।”[৮]


এই ফতোয়ায় সাক্ষ্যর করেছে আব্দুল আজীজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, শায়খ আব্দুর রাজ্জাক আফিফি, শায়খ আব্দুল্লাহ বিন কুউদ। তাদের কাছে উল্লেখিত কিতাবগুলো এতোটা গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলোকে শিরকের অন্ধকার থেকে হেদায়াতের আলো দানকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। আমরা তাদের এই দাবীর বাস্তবতা বিশ্লেষণ করবো ইনশাআল্লাহ।

মোট কথা, উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির এই কিতাব দু’টি সালাফীদের মৌলিক আক্বিদার কিতাব এবং এগুলো তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিতাবটি সালাফীদের মৌলিক আক্বিদার কিতাব হওয়ায় এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে, বর্তমানের সালাফীরা হলো কাররামিয়াদের উত্তরসূরী। এই কিতাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বিদা বিরোধী যেসব আক্বিদা রয়েছে সেগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করবো।

দারিমি রহ: এর কিতাবে শরীয়া বিরোধী আক্বিদাসমূহ:

উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির কিতাব দু’টিতে প্রচুর পরিমাণ জাল ও যয়ীফ বর্ণনা রয়েছে। কিছু কিছু বর্ণনাতে এমন কিছু শব্দ রয়েছে যেগুলো কুফুরী শিরকী আক্বিদা বহণ করে। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে কিতাব দু’টিতে উল্লেখিত ভ্রান্ত আক্বিদাগুলো উল্লেখ করছি।
১. আল্লাহর জন্য হরকত বা নড়া-চড়া সাব্যস্ত করেছে।
২. আল্লাহর জন্য স্থান সাব্যস্ত করেছে।
৩. আল্লাহ তায়ালা ও সৃষ্টির মাঝে দূরত্ব সাব্যস্ত করেছে।
৪. আল্লাহ তায়ালার জন্য হদ বা সীমা সাব্যস্ত করেছে।
৫. যারা আল্লাহ তায়ালার জন্য সীমা সাব্যস্ত করেনি, তাদেরকে কাফের বলেছে।
৬. সৃষ্টি আল্লাহ তায়ালাকে বহন করে অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা মাহমুল।
৭. আল্লাহ তায়ালার জন্য স্পর্শ সাব্যস্ত করেছে অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা স্পর্শ করেন। তার মতে আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আ.কে নিজ হাতের স্পর্শ দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.২৬, ২৯।]
৮. দূরত্বের বিবেচনায় আল্লাহ তায়ালা উপরের দিকে রয়েছেন। এমনকি পাহাড়ের উপরের অংশ নিচের অংশ থেকে আল্লাহ তায়ালার অধিক নিকটবর্তী।
৯. আরশকে অনাদি সাব্যস্ত করেছে। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.১২২।]
১০. সে বলেছে, আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে মাছির উপরও বসতে পারেন, তাহলে তিনি আরশ উপর কেন বসতে পারবেন না?
১১. সে বলেছে আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর বসেন এবং আরশ থেকে তিনি চার আঙ্গুল বড়। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.১১২।]
১২. আল্লাহ তায়ালা কখনও আরশের উপর বসেন কখনও কুরসীর উপর বসেন। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.৭২।]
১৩. সে আল্লাহর কথা বলার জন্য জিহ্বা সাব্যস্ত করেছে। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.৭৪।]
১৪. সে বলেছে, আল্লাহ তায়ালা যখন ইচ্ছা চলা-ফেরা করেন, যখন ইচ্ছা দাঁড়ান, যখন ইচ্ছা বসেন। [রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.২০, তাহকীক হামেদ আল-ফকী।]

আল্লাহ তায়ালার জন্য স্থান সাব্যস্তকরণ:

উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি বলেছে,
كيف يهتدي بشر للتوحيد وهو لا يعرف مكان واحده
অর্থ: বিশর কীভাবে তাউহীদের হেদায়াত পাবে, সে তো তার প্রভূর স্থান সম্পর্কে জানে না।[৯]
আল্লাহ তায়ালার সীমা:
উসমান ইবনে সাইদ একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছে, বাবুল হদ্দি ওয়াল আরশি অর্থাৎ আল্লাহর সীমা ও আরশের পরিচ্ছেদ। এ পরিচ্ছেদে তিনি আল্লাহর সমাপ্তি ও সীমা সাব্যস্ত করেছেন। এবং যারা আল্লাহর সীমা সাব্যস্ত করে না, তাদেরকে কাফের বলেছেন। উসমান ইবনে সাইদ লিখেছে,
وادعي المعارض ايضا أنه ليس لله حد ولاغاية و نهاية
অর্থ: প্রতিপক্ষ দাবী করেছে যে, আল্লাহ তায়ালার কোন সীমা, পরিসীমা ও সমাপ্তি নেই। [১০]
এরপর সে লিখেছে,
قال أبو سعيد : والله تعالى له حد لا يعلمه أحد غيره . و لا يجوز لأحد أن يتوهم لحده غاية في نفسه . ولكن نؤمن بالحد . ونكل علم ذلك إلى الله . والمكانة أيضا حد ، وهو على عرشه قوق سمواته . فهذان حدان اثنتان
“আল্লাহ তায়ালার সীমা রয়েছে। তিনি ছাড়া এই সীমা সম্পর্কে কেউ জানে না। কারও জন্য নিজের অন্তরে আল্লাহর সীমার সমাপ্তি কল্পনা করা জায়েজ নয়। বরং আমরা আল্লাহর সীমার উপর ঈমান আনবো এবং এর জ্ঞান আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করবো। আল্লাহর স্থানও একটি সীমা। তিনি আসমানের উপরে তার আরশের উপরে রয়েছেন। এই হলো আল্লাহ তায়ালার দু’টি সীমা।”[১১]

সে আরও লিখেছে,
وقد اتفقت كلمة من المسلمين والكافرين أن الله في السماء وحدوه بذلك
অর্থ: মুসলমান ও কাফের সবাই একমত যে আল্লাহ তায়ালা আসমানে রয়েছেন এবং তারা এভাবেই আল্লাহ তায়ালার সীমা সাব্যস্ত করেছে।[১২]
যারা আল্লাহ তায়ালার সীমা সাব্যস্ত করে না তাদেরকে সে কাফের বলেছে। সে লিখেছে,
هذا كله وما أشبهه شواهد ودلائل على الحد ومن لم يعترف به فقد كفر بتنزيل الله وجحد آيات الله
অর্থ: এগুলো হলো আল্লাহর সীমার দলিল। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সীমা সাব্যস্ত করে না সে আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআনের ব্যাপারে কুফুরী করে এবং আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে। [১৩]

আল্লাহ তায়ালা দাঁড়ান ও বসেন:

لأن الحي القيوم يفعل ما يشاء ويتحرك إذا شاء وينزل ويرتفع إذا يشاء ؛ ويقبض ويبسط ويقوم ويجلس إذا يشاء لأن أمارة ما بين الحي والميت التحرك . كل حي متحرك لا محالة . وكل ميت غير متحرك لا محالة .
অর্থ: চিরঞ্জীব ও চির শক্তিধর আল্লাহ তায়ালা যা ইচ্ছা তাই করেন। যখন ইচ্ছা তিনি চলাচল করেন। যখন ইচ্ছা অবতরণ করেন, যখন ইচ্ছা উপরে ওঠেন। যখন ইচ্ছা ধারণ করেন, যখন ইচ্ছা বিস্তৃত করেন। যখন ইচ্ছা তিনি দাঁড়ান, যখন ইচ্ছা বসেন।[১৪]
একজন বুদ্ধিমান লোক এধরনের কুফুরী কথাকে আল্লাহ তায়ালার দিকে কীভাবে সম্পৃক্ত করে? কারও যদি সামান্যতম তাউহীদের জ্ঞান থাকে, তবে সে এধরনের কুফুরী কথা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করতে পারে না। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, আল্লাহর ইচ্ছার দিকে সম্পৃক্ত করে এগুরো সাব্যস্ত করেছে। তাহলে হিন্দুদের অপরাধ কী? তারা বলবে, ভগবান যখন ইচ্ছা গাভীর রূপ নিতে পারেন, মানুষের রূপ নিতে পারেন, গাছের রূপ নিতে পারেন। খ্রিষ্টানদেরই বা অপরাধ কী? তারাও বলবে, আল্লাহ তায়ালা যখন ইচ্ছা ইসা আ.এর রূপ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, সে লিখেছে, আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে মাছির উপরও বসতে পারেন।
إن الله أعظم من كل شيء وأكبر من كل خلق، ولم يحمله العرش عظما ولا قوة، ولا حملة العرش حملوه بقوتهم ولا استقلوا بعرشه، ولكنهم حملوه بقدرته، وقد بلغنا أنهم حين حملوا العرش وفوقه الجبار في عزته وبهائه ضعفوا عن حمله واستكانوا وجثوا على ركبهم حتى لقنوا لا حول ولا قوة إلا بالله، فاستقلوا به بقدرة الله وإرادته، ولولا ذلك ما استقل به العرش ولا الحملة ولا السموات ولا الأرض ولا من فيهن، ولو قد شاء لاستقر على ظهر بعوضة فاستقلت به بقدرته ولطف ربوبيته، فكيف على عرش عظيم أكبر من السموات والأرض

অর্থ: আল্লাহ তায়ালা সব কিছু থেকে মহিমান্বি এবং তিনি সব সৃষ্টি থেকে বড়। আরশ আল্লাহ তায়ালাকে নিজের ক্ষমতা বা বড়ত্বের দ্বারা বহন করেনি। আরশ বহনকারী ফেরেশতারা নিজেদের ক্ষমতা ও একক শক্তি দ্বারা আল্লাহ তায়ালাকে বহন করেনি। বরং তারা আল্লাহর দেয়া ক্ষমতায় তাকে বহন করেছে। আমাদের কাছে বর্ণনা রয়েছে, যখন তারা আরশ বহন করে এবং আরশের উপর মহান আল্লাহ তায়ালা রয়েছেন, তারা এটা বহন করতে দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা স্থির হয়ে পড়ে। এবং হাঁটু গেড়ে বসে যায়। এরপর তাদেরকে বার বার লা হাওলা ওলা ক্ওুয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ পড়ার নির্দেশ হয়। অত:পর তারা আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছায় আল্লাহ তায়ালাকে বহন করে। যদি আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছা না থাকতো, তাহলে আরশ, আরশ বহনকারী ফেরেশতা এমনকি আসমান-জমিনের কেউ আল্লাহ তায়ালাকে বহন করতে পারতো না। যদি আল্লাহ পাক ইচ্ছা করেন, একটা মশার উপর বসতে পারেন, আল্লাহ পাকের কুদরতে মশা আল্লাহ তায়ালাকে বহন করবে, তাহলে আরশ কেন আল্লাহ তায়ালাকে বহন করতে পারবে না, যেটা আসমান ও জমিন থেকে বড়।[১৫]


একজন মুসলমান কীভাবে এধরনের কুফুরী কথা লিখতে পারে? কট্রর কাররামিয়া ছাড়া এধরনের নিকৃষ্ট কথা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করার ধৃষ্টতা অন্য কেউ দেখাবে কি না সন্দেহ। মুজাসসিমা ও মুশাববিহা আক্বিদা এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, আল্লাহ তায়ালার দিকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কথা সম্পৃক্ত করতেও সামান্য দ্বিধা করে না। আমাদের আশ্চর্যের সীমা থাকে না, যখন দেখি, এধরনের কুফুরী আক্বিদা থেকে ইবনে তাইমিয়া দলিল প্রদান করে এবং এগুলো তার কিতাবে উল্লেখ করে। কারও উদ্ধৃতি উল্লেখ করার দু’টি উদ্দেশ্য থাকে। ১. তার কথা সমর্থন করা। ২. তার কথা খন্ডনের জন্য সেগুলো উল্লেখ করা। ইবনে তাইমিয়া মূলত: উসমান ইবেন সাইদ আদ-দারিমির এই ভ্রান্ত আক্বিদা সমর্থন করে এগুলো তার কিতাবে উল্লেখ করেছে। বয়ানু তালবিসিল জাহমিয়া কিতাবে তিনি দু’বার[১৬]

এই বক্তব্য উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অমুসলিমরা এই কথা থেকে তাদের কুফুরী আক্বিদাগুলো প্রমাণ করতে পারবে খুব সহজেই। আল্লাহ তায়ালা যদি মাছির পিঠের উপর বসতে পারেন, তাহলে তিনি ঈসা আ. এর আকৃতি ধরে কেন আসতে পারবেন না? এটা সম্ভব হলে ওটা অসম্ভব হবে কেন? এজন্য খ্রিষ্টান লেখক ক্রিস্টোফার হাউজ দি টেলিগ্রাফ এর ব্লগে ৪ঠা এপ্রিল, ২০০৯ সালে একটি নিবন্ধ লিখেছে।

সে এর নাম দিয়েছে, Ibn Taymiyya’s mosquito and the Gospel of St John অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়ার মাছি ও গোস্পেল অব জন।

ক্রিস্টোফার হাউজ তার প্রবন্ধের শেষে লিখেছে,
I’m not sure where mosquitos come in. But if God could settle on a mosquito’s back, why could he not take flesh and dwell amongst us?
অর্থ: “আমি জানি না, মাছির ধারণা কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যদি মাছির পিঠে বসতে পারেন, তাহলে তিনি কেন রক্ত-মাংস গ্রহণ করে আমাদের মাঝে বসবাস করতে পারবেন না?[১৭]


পৃথিবীর এমন কোন নিকৃষ্ট আক্বিদা নেই, যা এই মাছির ধারণা থেকে প্রমাণ করা যাবে না। বহু ঈশ্বরের ধারণা, সর্বশ্বেরবাদ, অবতার, ত্রিত্ববাদসহ পৃথিবীর যতো নিকৃষ্ট আক্বিদা আছে সব কিছু উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি ও ইবনে তাইমিয়ার এই ধারণা থেকে প্রমাণ করা সম্ভব। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে এধরনের স্পষ্ট ভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন।


ইমাম ইবনে জাহবাল কিলাবীর লেখা আর-রদ্দু আলা মান কালা বিল জিহা এর ইংরেজী অনুবাদ করেছে, ড.জিবরীল ফুয়াদ হাদ্দাদ। তিনি এর ইংরেজী নাম দিয়েছেন, The Refutation of him [Ibn Taymiyya] who attributes direction to Allah [Al Raddu ala Man Qala bil Jiha]
এই কিতাবের ভূমিকা লেখে দিয়েছেন শায়খ ওহবী সুলাইমান গাওজী রহ। ড.জিবরীল ফুয়াদ এই বইয়ের ৮৩ পৃষ্ঠায় ইবনে তাইমিয়া ও উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমির মাছির ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন।[১৮]

পাহাড়ের উপরের অংশ নিচের অংশ থেকে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী:

উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি তার কিতাবে লিখেছে,
فيقال لهذا المعارض المدعي ما لا علم له من أنبأك أن رأس الجبل ليس بأقرب إلى الله تعالى من أسفله لأنه من آمن بأن الله فوق عرشه فوق سماواته علم يقينا أن رأس الجبل أقرب إلى الله من أسفله
অর্থ: “এই অজ্ঞ অভিযোগকারীকে বলা হবে, তোমাকে কে বলেছে, পাহাড়ের উপরের অংশ পাহাড়ের নিচের অংশ থেকে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী নয়? কেননা যে আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে যে, আল্লাহ আসমান সমূহের উপরে আরশের উপরে রয়েছেন সে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, পাহাড়ের উপরের অংশ নিচের অংশ থেকে অধিক নিকটবর্তী।”[১৯]


ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এই বক্তব্যের উপর মন্তব্য লিখেছেন,
فعند إمام المجسمة هذا ، من علا في الجو بالطائرة يكون أقرب إلي معبوده من هذا وذاك ويدل كلامه هذا علي أنه كان يتطلع إلي معبوده من رؤوس الجبال و المآذن و المراصد كما هو صنيع الصائبة الحرانية عبيدة الأجرام العلوية وأما المسلمون فهم يعتقدون أن الله منزه عن المكان وأن نسبته إلي الأمكنة سواء فليس القرب منه بالمسافة وليس البعدعنه بالمسافة قال الله تعالي واسجد و اقترب وقال النبي صلي الله عليه وسلم فيما أخرجه النسائي وغيره أقرب ما يكون العبد من ربه وهو ساجد …ومن الذي يجهل أن سمت رأس هذا الواقف علي هذا الجبل في هذا القطر يعاكس كل المعاكسة إتجاه رأس ذلك الواقف علي رأس ذلك الجبل في أمريكا مثلا
অর্থ: ভ্রান্ত মুজাসসিমা ফেরকার ইমামমের নিকট যে বিমান বা হেলিকপ্টারে উপরের দিকে উঠবে সে অন্যদের চেয়ে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হবে। তার এ কথা থেকে বোঝা যায় সে পাহাড়, মিনার ও বড় বড় অট্রালিকার উপর উঠে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতো। যেমন হাররানী সায়েবারা আজরামে আলিয়া বা মহাজগতিক কিছু বস্তুর পূজা করতো। মুসলমানদের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা স্থান থেকে পবিত্র। আল্লাহ তায়ালার জন্য সমস্ত মাখলুক বা স্থান সমান। আল্লাহর নৈকট্য দ্বারা পরিমাপ বা স্থানগত নৈকট্য বোঝায় না এবং আল্লাহর দূরত্ব দ্বারা পরিমাপ বা স্থানগত দূরত্ব উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন [অনুবাদ], সেজদা দাও এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হও।[২০]

ইমাম নাসায়ীসহ অন্যান্য ইমামগণ রাসূল স. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন [অনুবাদ]: সিজদারত অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়।


একথা কে না জানে যে, কোন এক মেরুর কোন পাহাড়ের উপরে কেউ থাকলে ঠিক তার বিপরীত মেরু অনুযায়ী সে নিচে রয়েছে। যেমন আমেরিকার কোন পাহাড়ে কেউ থাকলে সে আমাদের ঠিক নিচে রয়েছে। [২১]


ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. আরও লিখেছেন,
فتبا لهذا العقل الوثني لهذا الهرم وتبا ثم تبا لعقول الذين يتابعونه في ذلك أو يثنون عليه
অর্থ: “ এই হিন্দুয়ানী চিন্তা এবং পিরামিডিও ধারণা ধ্বংস হোক। ধ্বংস তাদের জন্য যারা এই চেতনা অনুসরণ করে অথবা এগুলোর প্রশংসা করে। [২২]


দারিমির কিতাবে যেসব আক্বিদা লেখা আছে সেগুলো মুসলমানদের আক্বিদা নয়। এগুলো সব কাররামিয়া ও মুজাসসিমাদের আক্বিদা। বর্তমান সালাফীরা এসব ভ্রান্ত কুফুরী শিরকী আক্বিদাকে নতুন নাম দিয়ে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে। বর্তমানের সালাফীরা মূলত: কাররামিয়াদের আক্বিদাগুলো মানুষের সামনে প্রচার করছে। তাদের সাথে কাররামিয়াদের বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ পাক পুরো মুসলিম উম্মাহকে এসব হিন্দুয়ানী আক্বিদা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।
উসমান ইবনে সাইদ সম্পর্কে আমাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত:


ঐতিহাসিক ও রিজাল শাস্ত্রের ইমামগণ উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি (মৃত:২৮০ হি:) এর জিবনী লিখেছেন এবং অনেকেই তার প্রশংসা করেছেন। তবে ইমাম যাহাবী রহ. আল্লাহর গুণাবলীর ক্ষেত্রে তার বাড়া-বাড়ির কথা স্বীকার করেছেন।[২৩]

সালাফী শায়খ আলবানীও দারিমির এই বাড়াবাড়ির কথা স্বীকার করেছে।[২৪]


ইমাম তাজুদ্দিন সুবকী রহ. লিখেছেন, তিনি কাররামিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন এবং তাদের বিরোধীতা করেছেন। ইমাম সুবকির বক্তব্য থেকে একটা বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি মূলত: কাররামিয়াদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, এজন্য কাররামিয়ারা তার নামে দুর্নাম করার জন্য এই বিষয়গুলো তার কিতাবে ঢুকিয়েছে। বিষয়টি যদি এমন হয় যে, কাররামিয়ারা তার কিতাবে এসব কুফুরী আক্বিদা ঢুকিয়েছে, তাহলে উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি এসব ভ্রান্ত আক্বিদা থেকে মুক্ত ছিলেন বলে আমরা মেনে নেবো। কিন্তু তিনি যদি এগুলো লিখে থাকেন, তাহলে তিনিই অবশ্যই ভ্রান্ত আক্বিদার অনুসারী মুজাসসিমা ছিলেন।
উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি এগুলো লিখেছে কি না, সেটা বড় বিষয় নয়। বরং যারা কুফুরী শিরকে ভরা এসব কিতাবের প্রশংসা করছে, এগুলো প্রকাশ করছে এবং এগুলোর প্রতি মানুষকে দাওয়া দিচ্ছে তাদের সম্পর্কে আমাদের কী রাখা উচিৎ?


প্রথমত: স্পষ্ট কুফুরী শিরকে ভরা এসব কিতাব পড়ার প্রতি উৎসাহিত করে, এগুলোর প্রশংসা করে এবং এগুলোর প্রকাশ, তাহকী এবং প্রচারের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে, তারা মূলত: এগুলো প্রকাশ ও প্রচারের দ্বারা মানুষকে ভ্রান্ত আক্বিদার দিকে দাওয়াত দেয়। সাধারণ মানুষের মাঝে এগুলো প্রকাশ, প্রচার ও এগুলোর প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ। যারা এগুলো করছে তারা সাধারণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে লিপ্ত রয়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা এসব কিতাব প্রচার করে সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট কুফুরীর দাওয়াত দিচ্ছে। এসব কিতাব যেহেতু সালাফী আক্বিদার মৌলিক কিতাব, সুতরাং বর্তমানের তথাকথিত সালাফী আক্বিদা মূলত: পথভ্রষ্ট কাররামিয়া ফেরকারই নতুন রূপ। কাররামিয়অ ফেরকা যেমন পথভ্রষ্ট, বর্তমানের সালাফী আক্বিদাও বাতিল ও পথভ্রষ্ট। যারা সালাফী আক্বিদার নামে এগুলো প্রচার করেছেন বা করছেন, তাদের জন্য তওবা করে সহীহ আক্বিদা গ্রহণ করা জরুরি।

উদ্ধৃিতসমূহ:
[১] ইউটিউবের এই লিংকে তার দরস রয়েছে। https://www.youtube.com/watch?v=tfBzsPKLXGQ
[২] এই লিংকে তার অডিও দরস পাওয়া যাবে। https://archive.org/details/jasim-jahmiah-darimi
[৩] নকজু উসমান ইবনে সাইদ আলা বিশ আল-মারিসি, আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আর-রাজিহি এর ভূমিকা।
[৪] ইজতেমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়া, পৃ.৯০।
[৫] নকজু উসমান ইবনে সাইদ আলা বিশ আল-মারিসি, আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আর-রাজিহি এর ভূমিকা
[৬] নকজু উসমান ইবনে সাইদ আলা বিশ আল-মারিসি, পৃ.৯৯, তাহকীক, ড.রশীদ বিন হাসান আল-মায়ী।
[৭] https://archive.org/details/jasim-jahmiah-darimi
[৮] ফাতাওয়া আল-লাজনাতুত দাইমা, খ.৭, পৃ.৩৫৬। ফতোয়া নং ৪০৮৩।
[৯] নকজু উসমান ইবনে সাইদ আদ-দারিমি, খ.১, পৃ.১৪২।
[১০] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.২৩।
[১১] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.২৩।
[১২] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.২৫।
[১৩] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.২৪।
[১৪] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.২০। তাহকীক, হামেদ আল-ফকী।
[১৫] রদ্দুদ দারিমি আলা বিশর আল-মারিসি, পৃ.৮৫। তাহকীক, হামেদ আল-ফকী।
[১৬] বয়ানু তালবিসিল জাহমিয়া, খ.১, পৃ.৫৬৮। খ.২, পৃ.১৬০।
[১৭] http://blogs.telegraph.co.uk/culture/christopherhowse/9382627/ibn_taymiyyas_mosquito_and_the_gospel_of_st_john/
[১৮] Dr. G. F. Haddad, The Refutation of Him Who Attributes Direction to Allah, Aqsa Publications, Birmingham, UK, 2008, p. 83.
[১৯] রদ্দুদ দারিমি আল বিশর আল-মারিসি, পৃ.১০০।
[২০] সূরা আলাক, আয়াত নং ১৯।
[২১] মাকালাতুল কাউসারী, আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর প্রবন্ধ সংকলন, পৃ.২৬৪-২৬৫।
[২২] মাকালাতুল কাউসারী, পৃ.২৬৫।
[২৩] আল-উলু, খ.১, পৃ.১৯৫।
[২৪] মউসুআতুল আল্লামা আলবানী, খ.১, পৃ.১৩৮।

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83