আক্বিদা

ওয়াহদাতুল উজুদ সম্পর্কে দেওবন্দী আলেমগণের অবস্থান

ইজহারুল ইসলাম রবি, 12 সেপ্টে., 2021
26

মূল আলোচনা শুরুর পূর্বে দু’টি পরিভাষা বুঝে নেয় আবশ্যক। 

১. হুলুল :

হুলুল শব্দের অর্থ প্রবেশ করা।  একটা বস্তু অন্য আরেকটির মাঝে প্রবেশ করার পর যদি উভয় বস্তু তাদের নিজ সত্ত্বা অবশিষ্ট রেখে বিদ্যমান থাকে তাহলে তাকে হুলুল বলে। অর্থাৎ যে বস্তু কোন কিছুর মাঝে ঢুকছে সেটিও তার নিজ সত্ত্বা ঠিক রাখবে আবার যার মাঝে প্রবেশ করছে, সেটিও তার নিজ সত্ত্বা অবশিষ্ট রাখবে।  বিষয়টিকে আরবীতে হুলুল বলে। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে হুলুলের আকিদা সম্পূর্ণ কুফুরী। যেমন, কেউ যদি বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তায়ালা স্থানগতভাবে আসমানে রয়েছেন তাহলে এটি হুলুল হবে। কারণ আসমান একটি মাখলুক বা সৃষ্টি। কোন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর সত্ত্বা প্রবেশ করেছেন বা আছেন এজাতীয় বিশ্বাসই মূলত: হুলুল। 

বাস্তব ক্ষেত্রে হুলুলের একটি উদাহরণ হলো, চিনি ও বালির মিশ্রণ। এ মিশ্রনে চিনি ও বালি নিজ সত্বা অবশিষ্ট রেখে অবস্থান করে থাকে। রসায়নের ভাষায় এধরনের মিশ্রণকে অসমসত্ত্ব মিশ্রণ বা Heterogeneous mix  বলে। 

খ্রিষ্টানরা হযরত ইসা আ. সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর সত্বা হযরত ইসা আ. এর মাঝে প্রবেশ করেছে। এটিও মূলত: হুলুল এর আকিদা  থেকে এসেছে। মোট কথা, কোন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর সত্বা প্রবেশ করেছে, এজাতীয় বিশ্বাস রাখা হলো হুলুল । এই আকিদা নি:সন্দেহে কুফুরী। 

২. ইত্তেহাদ:

ইত্তেহাদ শব্দের অর্থ  মিশে যাওয়া, একীভূত হওয়া। পরিভাষায়, দু’টি বস্তুর একটি যদি আরেকটির মাঝে প্রবেশের পর একটি বস্তু যদি নিজ সত্ত্বা অন্যটির মাঝে বিলীন  করে  দেয় অর্থাৎ একটা আরেকটার সাথে মিশে যায়, তাহলে একে ইত্তেহাদ বলে। 

ইত্তেহাদের উদাহরণ হলো, চিনি ও পানির মিশ্রণ। এক্ষেত্র চিনির অস্তিত্ত্ব পানির সাথে একীভূত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ারার ক্ষেত্রে কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর সত্ত্বা সৃষ্টির প্রত্যেক অণুতে বিন্দুতে মিশে আছে, কিংবা সৃষ্টির সব কিছুকে সে আল্লাহ বলে বিম্বাাস রাখে, তবে এটি ইত্তেহাদের আকিদা হবে। 

হুলুল ও ইত্তেহাদ দু’টোই কুফুরী আকিদা। যারা ওয়হদাতুল উজুদকে কুফুরী আকিদা বলার চেষ্টা করেন, তারা মূলত: এই দু’টি কুফুরী আকিদার কারণে একে কুফুরী বলেছেন। কিন্তু কেউ যদি এই দুটি আকিদা থেকে মুক্ত হয়ে ওয়াহদাতুল উজুদের আকিদায় বিশ্বাস রাখে, তবে তা কখনও কুফুরী হবে না। 

দেওবন্দী আলেমদের নিকট ওযাহদাতুল উজুদ:

============================

1. আশরাফ আলী থানবী রহ. এর বক্তব্য:

আশরাফ আলী থানবী রহ. বিভিন্ন কিতাবে ওয়াহদাতুল উজুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এমনকি তিনি এর উপর একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। বাওয়াদিরুন নাওয়াদির কিতাবের ৬৪০ পৃষ্ঠায় থানবী রহ, এর এ পুস্তিকাটি রয়েছে। আশরাফ থানবী রহ. স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াহদাতুল উজুদের আকিদা হুলুল ও ইত্তেহাদ থেকে মুক্ত। তিনি বিভিন্ন জায়গায় বলেন, আমরা কখনও হুলুল ও ইত্তেহাদের আকিদা রাখি না। থানবী রহ, এধরনের স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পরও খান্নাস মাদানী রহ, সহ দেওবন্দী আলেমদের উপর মিথ্যাচার করেছে। 

ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যা:

======================

জাওয়াহিরাতে হাকীমুল উম্মত বইযের ৪১ পৃষ্ঠায় ওয়াহদাতুল উজুদের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। থানবী রহ, স্পষ্ট বলেন,

” ওযাহদাতুল উজুদের বাস্তবতা:

এই তাওহীদকে লা মাউজুদা ইল্লাল্লাহ ( আল্লাহ ছাড়া কোন কিছুর প্রকৃত অস্তিত্ব নেই ) বলা হয়। একেই ওয়াহদাতুল উজুদ বলে। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ এজাতীয় বিশ্বাস রাখতে আদিষ্ট নয়। শরীয়তে একে তাউহীদও বলা হয়নি। এর বিপরীত বিশ্বাসকে শরীয়তে শিরকও বলা হয়নি। যেমন, রিয়া (লৌকিকতা) কে শিরক বলা হয়েছে।  এজন্য একে তাউহীদ বা একত্ববাদের স্তর মনে করা ভুল। তবে পরিভাষা ব্যবহারে কোন দোষ নেই। উদ্দেশ্য হলো, শরীয়তে যে তাউহীদের আদেশ করা হয়েছে, সেটি মূলত: দূটি স্তরের। একটি স্তর ইমানের মাঝে আরেকটি স্তর আমলের মাঝে। তাউহীদে উজুদী বা ওয়াহদাতুল উজুদ শরীয়তের পক্ষ থেকে আদিষ্ট কোন তাওহীদ নয়। তবে এটি তাউহীদে মাকসুদ (একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই সব কিছু করা) এর জন্য সহায়ক। কারণ এর মাধ্যমে বিশ্বাসগত তাউহীদ ও তাউহীদে মাকসুদ অর্জন  ও এর পূর্ণতা সহজ হয়। কিন্তু কখনও ওয়াহদাতুল উজুদ এমন স্তরের নয় যে, এটি ব্যতীত ইমান পূর্ণই হবে না। না না। কখনও না। এটি ব্যতীত তাউহীদ পরিপূর্ণ হতে পারে। নতুবা একথা দ্বারা আবশ্যক হয় যে, শরীয়ত প্রদত্ত বিধি-বিধান দ্বারা কেউ সূফীই হতে পারবে না। অথচ তাসাউফ তো ওয়াহদাতুল উজুদের উপর নির্ভরশীল নয়।  আমি তো একথা অবশ্যই বলবো যে, সূফী ব্যতীত অন্যরা পরিপূর্ণ মুমিন হয় না, তবে সাথে সাথে একথাও অবশ্যই বলবো যে, সূফী হওয়াটা ওয়াহদাতুল উজুদের উপর নির্ভরশীল নয়।  বরং এটি ছাড়াও তাসাউফ অর্জিত হতে পারে। আমাদের নিকট গবেষক ইমামগণ বিশেষভাবে মুজতাহিদ ইমামগণ সকলেই সূফী ছিলেন। কেননা তাসাউফ দ্বারা যেটি আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তাদের মাঝে সেটি পরিপুর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো। অথচ তাদের মাঝে ওয়াহদাতুল উজুদের প্রভাব ছিলো না।

ওয়াহদাতুল উজুদ দ্বারা প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কাউকে নিজের মাকসুদ বা উদ্দিষ্ট বানাবে না এবং সকল কাজে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই উদ্দিষ্ট বানাবে। সুতরাং এ বিষয়টি ওয়াহদাতুল উজুদ ছাড়াও অর্জিত হতে পারে। তবে এটিও সত্য যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য সকল কিছুর অস্তিত্ত্ব থেকে যদি নিজের চিন্তাকে মুক্ত রাখা যায়, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই একমাত্র লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ হয়। 

পয়ষট্রি বছর পরে আজ অনুধাবন করেছি যে, ওয়াহদাতুল উজুদ তাউহীদে মাকসুদের কোন স্তরই নয়। এতো দিন আমিও একে তাউহীদে মাকসুদের একটি স্তর মনে করতাম। আল-হামদুলিল্লাহ, আজ ভুল অনুধাবন করেছি। একারণে আমি যারপর নাই আনন্দিত। 

লা মাউজুদা ইল্লাল্লাহ বা ওয়াহদাতুল উজুদকে তাউহীদে হালীও বলে। কিন্তু এটি শরীয়ত নির্ধারিত তাউহীদের কোন স্তর নয়। বরং এটি একটি সহায়ক বিষয়। শরীয়তের তাউহীদের সর্বশেষ স্তর হলো, লা মাকসুদা ইল্লাল্লাহ ( আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য)। লা মাউজুদা ইল্লাল্লাহ এটি শরীযতের কোন নির্দেশনাও নয় বা এ ব্যাপারে  শরীয়তের পক্ষ থেকে কোন সওয়াবও নেই। এটিও যদি তাউহীদের কোন স্তর হতো, তাহলে শরীয়ত অবশ্যই এর আদেশ করতো এবং এর মাধ্যমে  সওয়াবও হতো।  কিন্তু বাস্তবে শরীয়ত এ ব্যাপারে চুপ রয়েছে। তবে কেউ যদি রুপক অর্থে তাউহীদের এই সহায়ক বিষয়টিকে তাউহীদ বলে, তবে এতে কোন সমস্যা নেই। কেননা, পরিভাষা ব্যবহারে কোন দোষ নেই। তবে একে যদি পূর্ণতা অর্জনের ভিত্তি মনে করো, তবুও ঠিক আছে। “

[জাওয়াহিরাতে হাকীমুল উম্মত, পৃ.৪১-৪২]

মূল বইয়ের ডাউনলোড লিংক

স্ক্রিনশট:

image

image

image

ওযাহদাতুল উজুদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

==================

বোখারী ও মুসলিমের হাদীসে রয়েছে, ” আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। আমার হাতেই সব কিছু। আমি রাত্র-দিন পরিবর্তন করি। “

রাত্র ও দিন (যা সময়ের অংশ) কে আমিই পরিবর্তন করি। মানুষ বিভিন্ন ঘটনার জন্য সময়কে দায়ী করে। অথচ সময় ও এর অন্তর্ভূক্ত সব কিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে।  সুতরাং সব কার্যকরণ ও ঘটনা বিচিত্র আমারই। এগুলোকে খারাপ বলার দ্বারা মূলত আমাকেই খারাপ বলা হয়। হাদীসটি বোখারী, মুসলিম, মুয়াত্তা, ও আবু দাউদ শরীফে রয়েছে। 

স্পষ্টত: আল্লাহ তায়ালা ও সময় একীভূত নয়। একীভূত না হওয়া সত্ত্বেও একে রুপক অর্থে এক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষক সূফীদের নিকটও, এই রুপক ব্যবহারের প্রতি লক্ষ্য রেখে উস্ত (আল্লাহ তায়ালা) এর জন্য হামা (সব কিছু) সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই রুপক ব্যবহারের ব্যাখ্যা হলো, হামা (সব কিছু) ও এর অন্তর্ভূক্ত সব কার্যাবলী ও বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহ এসব কিছুই আল্লাহ তায়ালার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সুতরাং এগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক ও অস্তিত্বদানের স্বাধীন ক্ষমতাধর হলে একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। হামা বা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য সব কিছু যেন কিছুই নয়। সুতরাং উল্লেখিত হাদীস দ্বারা সূফীদের এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। 

সমস্ত সৃষ্টি বাহ্য দৃষ্টিতে অস্তিত্ববান। প্রকৃতপক্ষে কোন সৃষ্টি প্রকৃত অস্তিত্ব তথা পরিপূর্ণ স্বাধীন অস্তিত্বের অধিকারী নয়। একমাত্র আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বই স্বাধীন, প্রকৃত ও পরিপূর্ণ অস্তিত্বের অধিকারী। এ বিষয়টিকেই প্রচলন ও পরিভাষায় হামা উস্ত (সব কিছুই তিনি) বলে ব্যক্ত করা হয়। এর দৃষ্টান্ত হলো, বিচাকর কোন বাদীকে বলল, তুমি পুলিশে রিপোটর্ করো। তুমি  কি কোন উকিলের সাথে পরামর্শ করেছো? তখন এই বাদী লোকটি বলল,” পুলিশ ও উকিল সব কিছুই আপনি।” লোকটির  একথা দ্বারা কখনও এ উদ্দেশ্য হয় না যে, বিচারক, পুলিশ ও উকিল সবই এক। তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বরং মূল উদ্দেশ্য হলো, পুলিশ ও উকিল কেউ-ই গণনায় আনার মতো নয় বা দৃষ্টিপাত করার মতো নয়। বরং আপনিই মামলার ফয়সালারী।  

একইভাবে এক্ষেত্রে বুঝে নেয়া দরকার যে, ওয়াহদাতুল উজুদ বা হামা উস্ত (সব কিছুই তিনি) এর দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, আল্লাহ ও সৃষ্টি সব এক। বরং উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টির অস্তিত্ব গননায় আনার মতো কিছুই নয়। বরং একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই ধর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর যতো সৃষ্টি রয়েছে, তাদেরও অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু সৃষ্টির কারও অস্তিত্ব স্বাধীন ও পরিপূর্ণ অস্তিত্বের তুলনায় কেমন যেন কোন অস্তিত্বই নেই। যাকে বাহ্য অস্তিত্ব বলে উল্লেখ করা হযেছে। 

বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো, প্রত্যেকটি গুণের দু’টি স্তর রয়েছে। ১. পরিপূর্ণ ও ২. অপূর্ণ। আর স্বীকৃত নিয়ম হলো, পরিপূর্ণ গুণের তুলনায় অপূর্ণ গুণটিকে কেমন যেন অস্তিত্বহীন ধরা হয়। 

এর দৃষ্টান্ত হলো, একজন নিম্ন পর্যায়ের বিচারক তার আদালতে নিজের ক্ষমতা জাহির করছিলো। এই পদে থেকে সে সাধারণ কোন প্রজাকে কোন মূল্য দেয় না। হঠাৎ দেশের বাদশাহ ঐ আদালতে এসে উপস্থিত হলো। বাদশাহকে দেখেই সে দিশেহারা হয়ে গেলো। নিজের সব অহংকার, আত্মগরিমা ও বড়ত্বের দাবী সব কিছু মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেলো। সুতরাং একজন সাধারণ বিচারক যখন নিজের পদকে বাদশাহর পদের সাথে তুলনা করে, তখন নিজের পদের কোন অস্তিত্বই খুজে পায় না। মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে। মুখ থেকে আওয়াজ বের হয় না, মাথা তুলে তাকাতেও পারে না। এই সময় যদিও তার পদ একেবারে অস্তিত্বহীন নয়, তবে তা গননায় আনার মতোও কিছু নয়। এই বিষয়টি যতক্ষণ মানুষের ধ্যান-ধারণায় বদ্ধমূল থাকে, ততক্ষণ একে তাউহীদ বলা হয়। এটি অর্জন মূলত: কোন পরিপুর্ণতা নয়। এটি যখন আল্লাহর পথের পথিকের সর্ব সময়ের বাস্তব অবস্থা হয়ে দাড়ায়, তখন একে ফানা বলে। এটি অর্জন উদ্দিষ্ট। ওয়াহদাতুশ শুহুদের সারকথা মূলত: এটিই। শব্দটিই আমাদের উল্লেখিত বক্তব্যকে সমর্থন করে। কেননা ওযাদাতুশ শুহুদের অর্থ হলো, শুহুদ বা দৃষ্টি এক দিকেই নিবন্ধিত থাকা। অর্থাৎ বাস্তবে তো বিভিন্ন বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু আল্লাহর পথের পথিক শুধু আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করবে এবং অন্য সব কিছুর অস্তিত্বকে কেমন যেন অস্তিত্বহীন মনে করবে। পূর্বের উদাহরণগুলি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আরেকটি সুস্পষ্ট উদাহরণ, যেটি শেখ সা’দী রহ. উল্লেখ করেছেন, 

“জোনাকি রাতে উজ্জ্বল বাতির মতো আলো দিতে থাকে। 

কেউ জোনাকিকে বলল, তুমি দিনে আলো দিতে কেন বের হও না?

জোনাকি খুবই সুন্দর উত্তর দিলো যে, আমি রাত ও দিন জঙ্গলেই তো থাকি। 

কিন্তু সূর্যের আলোর সামনে আমার আলো প্রকাশিত হয় না। “

সুতরাং ওয়াহদাতুল উজুদ ও ওয়াহদাতুশ শুহুদের মাঝে আক্ষরিক পার্থক্য রয়েছে। আমার শায়খ ও মুর্শিদ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. আমাকে এমনটিই বলেছেন। যেহেতু ওযাহদাতুল উজুদের অর্থ সাধারণ মানুষের মাঝে একটি ভ্রান্ত আকিদার জন্ম দেয়, একারণে গবেষক আলেমগণ এই পরিভাষায় পরিবর্তন আনেন। ওয়াহদাতুশ শুহুদ শব্দটি  ওয়াহদাুতল উজুদের তুলনায়  মূল বক্তব্যকে   স্পষ্টভাবে সমর্থন করে। কেননা, উল্লেখিত উদ্দেশ্য বর্ণনায় ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যবহার রুপক। আর ওয়াহদাতুশ শুহুদের ব্যবহার বাস্তব। এই মাসআলার শরয়ী দলিল হলো, আ্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর সত্ত্বা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংসশীল। আকাইদে নাসাফীর ব্যাখ্যাকার এমনটিই ব্যাখ্যা করেছেন। ” 

মুজাদ্দিদে মিল্লাত হাকীমুল উম্মত থানবী রহ আরও স্পষ্ট ভাষায় ওয়াহদাতুল উজুদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন,

” স্পষ্টত: সমস্ত পরিপূর্ণতা একমাত্র আল্লাহর জন্য। সৃষ্টির পরিপূর্ণতা আপেক্ষিক। কেননা এটি আল্লাহর দান ও রক্ষনাবেক্ষণের কারণেই মাখলুকের মাঝে রয়েছে। এধরনের আপেক্ষিক অস্তিত্বকে পরিভাষায় উজুদে জিল্লি বা ছায়া অস্তিত্ব বলা হয়। এখানে ছায়া দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালা হলেন একটি দেহ বা শরীর, আর মহাবিশ্ব আল্লাহর ছায়া। বরং ছায়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যেমন বলা হয় আমরা আপনার ছত্রছায়ায় রয়েছি। অর্থাৎ আপনার আশ্রয় ও হেফাজতে রয়েছি। আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তা আপনিই দিয়ে থাকেন। সুতরাং আমাদের অস্তিত্ব যেহেতু আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন, একারনে আমাদের অস্তিত্বকে উজুদে জিল্লী বা ছায়া অস্তিত্ব বলা হয়। একথা তো ধ্রুব সত্য যে, সৃষ্টির সব কিছুর অস্তিত্ব হাকিকী বা পরিপুর্ণ ও স্বাধীন অস্তিত্ব নয়। বরং আপেক্ষিক ও ছায়া অস্তিত্ব। যদি ছায়া অস্তিত্ব না ধরা হয, তাহলে একমাত্র অস্তিত্ব কেবল আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হয়। এ অর্থে অস্তিত্বকে একক  বলা হবে। একেই মূলত: ওয়াহদাতুল উজুদ বলে। যদি সৃষ্টির এই আপেক্ষিক অস্তিত্বকেও মেনে নেয়া হয় যে, বাস্তবে কিছু অস্তিত্ব তো আছে, একেবারে অস্তিত্বহীন তো নয়, কিন্তু আল্লাহর প্রতি অধিক মনোনিবেশের কারণে তার এই অস্তিত্ব অনুভূত হচ্ছে না, তবে এ স্তরকে ওয়াহদাতুশ শুহুদ বলে। এর উদাহরণ হলো, চাদের আলো সূর্যের আলো থেকেই অর্জিত হয়। চাদের এই ছায়া আলো যদি না ধরা হয়, তাহলে আলোকিত চাদকেও অন্ধকার বলা যায়। এটি ওয়াহদাতুল উজুদের উদাহরণ। আর যদি চাদের আলোকেও গণনায় আনা হয়, (কারণ কিছু তো আলো আছে, যদিও সুর্যের আলো প্রকাশিত হলে এটি সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ মনে হয়,) তবে একে ওয়াহদাতুশ শুহুদ বলে। দু’টো বিষয়ের পরিণতি এক। যেহেতু মূল ও আপেক্ষিক বিষয়ের মাঝে একধরনের শক্তিশালী সম্পর্ক থাকে একারণে সূফীদের পরিভাষায় একে আইনিয়াত বা অভিন্নতা  বলে। আইনিয়াত দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, মূল ও আপেক্ষিক দু’টি এক হয়ে গেছে। দু’টি এক হওয়ার বক্তব্য তো স্পষ্ট কুফুরী।  একারণে সুফীগণ আইনিয়াতের সাথে সাথে গাইরিয়াত বা ভিন্নতার কথাও বলে। সুতরাং আইনিয়ত বা অভিন্নতা একটি পরিভাষা। এর শাব্দিক অর্থ কখনও উদ্দেশ্য নয়।  ওয়াহদাতুল উজুদের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এটিই। এর অতিরিক্ত যদি কোন সূফীর কবিতা বা বক্তব্যে কিছু পাওয়া যায়, তবে তা ঐ সূফীর হালতে সুকর বা ভ্রমগ্রস্ত অবস্থার কারণে হয়েছে। একারণে তাকে ভর্সৎসনা করা উচিৎ নয়। আবার তার এজাতীয় কথা বর্ণনা করা কিংবা তার অনুসরণ করাও বৈধ নয়। “”

[শরীয়ত ও ত্বরীকত, পৃ.৩০৯-৩০১২, মাকতাবাতুল হক মুম্বাই]

মূল বইয়ের ডাউনলোড লিংক:

মূল বইয়ের স্ক্রিনশট:

image

image

image

image

image

স্রষ্টা ও সৃষ্টি কখনও এক হতে পারে না

১. আশরাফ আলী থানবী রহ. এর বক্তব্য:

আশরাফ থানবী রহ. তার বাওয়াদিরুন নাওয়াদির কিতাবে লিখেছেন, 

” ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যার সাথে হুলুল (স্রষ্টার প্রবেশবাদ) ও ইত্তেহাদ ( স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক হওয়া) এর কোন সম্পর্ক নেই।  তারা শুধু আল্লাহর একক ও স্বাধীন অস্তিত্বের কথা বলে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারও স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। শুধু ধারণাগত অস্তিত্ব রয়েছে। ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যাকারগণ ইত্তেহাদের প্রবক্তা নন যে, মহাবিশ্ব আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে একীভূত হয়ে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের বক্তব্য হুলুল থেকেও মুক্ত। কেননা হুলুলের ক্ষেত্রে যেটি প্রবেশ করছে এবং যার মধ্যে প্রবেশ করছে, দু’টোই বিদ্যমান থাকে, এরপর তাদের মাঝে একধরনের মিশ্রণ সৃষ্টি হয়।”

[বাওয়াদিরুন নাওয়াদির, পৃ.৬৪৮]

থানবী রহ. এর এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে দেওবন্দী উলামায়ে কেরাম হুলুল ও ইত্তেহাদের আকিদা রাখে না। 

মূল বইযের ডাউনলোড লিংক:

https://ia600406.us.archive.org/14/items/Bawadir-un-nawadirByShaykhAshrafAliThanvir.a/Bawadir-un-nawadirByShaykhAshrafAliThanvir.a.pdf

মূল বইয়ের স্ক্রিনশট:

image

image

২. আশরাফ আলী থানবী রহ. মনসুর হাল্লাজের আকিদা-বিশ্বাস ও তার জীবনী সম্পর্কে প্রচলিত অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনার চুল-চেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি এই  কিতাবের নাম দিয়েছেন, আল-কাউলুল মানসুর ফি ইবনিল মানসুর। 

এই কিতাবে থানবী রহ. স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, আমাদের আকিদা বিশ্বাস হুলুল ও ইত্তেহাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি এই কিতাবে একটা পুস্তিকার শিরোনাম দিয়েছেন, ত্বরিকুস সাদাদ ফি ইসবাতিল ওয়াহদাতি ও নাফইল ইত্তেহাদ অর্থাৎ ওয়াহদাতুল উজুদ ও স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক নয়, এ বিষয়ে সঠিক পথ”

আশরাফ আলী থানবী রহ. লিখেছেন,

” মনসুর হাল্লাজের তাউহীদ বিষয়ক আকিদা:

অনেকেই মনসুর হাল্লাজের এমন কিছু কথার কারণে ধোকায় নিপতিত হয়েছে, যা তার ভ্রমগ্রস্ত অবস্থা বা অধিক মহব্বতের অবস্থায় প্রকাশিত হয়েছে। তার সেসব কথার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি যেগুলো সে তার সুস্পষ্ট আকিদা বর্ণনার জন্য বলেছে। ইবনে মানসুরের বক্তব্য সংকলন অধ্যাযে আমরা সর্ব প্রথম মনসুর হাল্লাজের এধরনের সুস্পষ্ট তাউহীদ বিষয়ক বক্তব্য উল্লেখ করেছি। সেসব বক্তব্য  থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পস্ট যে, মনসুর হাল্লাজ পরিপূর্ণ তাউহীদে বিশ্বাসী এবং তাউহীদের বিষয়ে একজন গবেষক ছিলেন। মনসুর হাল্লাজ স্পষ্ট বলেছেন,

[আরবীর অনুবাদ] ” আল্লাহ তায়ালা ক্বাদীম বা অনাদির গুণের মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টি থেকে পৃথক হয়েছেন, তেমনি সমস্ত সৃষ্টি নশ্বর গুণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা থেকে পৃথক হয়েছে ” 

 

এখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন  ভাষায় বলেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা মাখলুকের সাথে ইত্তেহাদ বা একীভূত নন, তেমনি তিনি সৃষ্টির মাঝেও প্রবেশ করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা হুলুল ও ইত্তেহাদ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। 

এরপর মনসুর হাল্লাজ বলেন,

[আরবীর অনুবাদ] ” আল্লাহর পরিচয় লাভ করা হলো তাউহীদ। আর আল্লাহর তাউহীদ হলো আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টি থেকে পৃথক বিশ্বাস করা। “

 

সুতরাং যারা সূফীদেরকে অথবা তাদের মধ্যে মনসুর হাল্লাজ সম্পর্কে এই বলে দুর্নাম করার চেষ্টা করে যে, তারা স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে এক কিংবা স্রস্টা সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেছেন এধরনের আকিদার রাখে; এটি তাদের উপর সুষ্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ “

[সিরাতে মনসুর হাল্লাজ, পৃ.২২]

আশরাফ আলী থানবী রহ. এর বক্তব্য থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, দেওবন্দী আলেমরা হুলুল ও ইত্তেহাদ তথা স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক, এধরনের আকিদা কোন আকিদা কখনও রাখে না। অথচ মিথ্যুক মতি কতো জঘন্যভাবে দেওবন্দী আলেমদেরকে অপবাদ দিয়েছে। 

মূল বইয়ের ডাউনলোড লিংক:

https://ia600800.us.archive.org/24/items/Seerat-e-MansoorHallajShaykhZafarAhmadUsmanir.a/Seerat-e-MansoorHallajShaykhZafarAhmadUsmanir.a.pdf

মূল বইয়ের স্ক্রিনশট:

image

image

image

3. হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানবী রহ. তার শরীয়ত ও ত্বরীকত বইয়ে লিখেছেন,

“একইভাবে এক্ষেত্রে বুঝে নেয়া দরকার যে, ওয়াহদাতুল উজুদ বা হামা উস্ত (সব কিছুই তিনি) এর দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, আল্লাহ ও সৃষ্টি সব এক। বরং উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টির অস্তিত্ব গননায় আনার মতো কিছুই নয়। বরং একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই ধর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর যতো সৃষ্টি রয়েছে, তাদেরও অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু সৃষ্টির কারও অস্তিত্ব স্বাধীন ও পরিপূর্ণ অস্তিত্বের তুলনায় কেমন যেন কোন অস্তিত্বই নেই। যাকে বাহ্য অস্তিত্ব বলে উল্লেখ করা হযেছে। 

বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো, প্রত্যেকটি গুণের দু’টি স্তর রয়েছে। ১. পরিপূর্ণ ও ২. অপূর্ণ। আর স্বীকৃত নিয়ম হলো, পরিপূর্ণ গুণের তুলনায় অপূর্ণ গুণটিকে কেমন যেন অস্তিত্বহীন ধরা হয়।  এর দৃষ্টান্ত হলো, একজন নিম্ন পর্যায়ের বিচারক তার আদালতে নিজের ক্ষমতা জাহির করছিলো। এই পদে থেকে সে সাধারণ কোন প্রজাকে কোন মূল্য দেয় না। হঠাৎ দেশের বাদশাহ ঐ আদালতে এসে উপস্থিত হলো। বাদশাহকে দেখেই সে দিশেহারা হয়ে গেলো। নিজের সব অহংকার, আত্মগরিমা ও বড়ত্বের দাবী সব কিছু মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেলো। সুতরাং একজন সাধারণ বিচারক যখন নিজের পদকে বাদশাহর পদের সাথে তুলনা করে, তখন নিজের পদের কোন অস্তিত্বই খুজে পায় না। মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে। মুখ থেকে আওয়াজ বের হয় না, মাথা তুলে তাকাতেও পারে না। এই সময় যদিও তার পদ একেবারে অস্তিত্বহীন নয়, তবে তা গননায় আনার মতোও কিছু নয়।””

[শরীয়ত ও ত্বরীকত, পৃ.৩১০]

মূল বইয়ের ডাউনলোড লিংক:

http://ia600807.us.archive.org/26/items/Shariat-o-TareeqatByShaykhAshrafAliThanvir.aCollectedByShaykh/Shariat-o-TareeqatByShaykhAshrafAliThanvir.aCollectedByShaykhMuhammadDeen.pdf

মূল বইযের স্ক্রিনশট:

image

image

২. হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর বক্তব্য:

===============================================

রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. তার ইমদাদুস সুলুক বইয়ে একটি পরিচ্চেদের শিরোনাম দিয়েছেন, ” আক্বিদায়ে হুলুল কি তারদীদ” অর্থাৎ হুলুলের আকিদার খন্ডন।  রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. লিখেছেন,

” অনেক মূর্খকে অভিশপ্ত শয়তান মুজাসসিমা তথা দেহবাদী ফেরকায় নিপতিত করে। যেমনটি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে শয়তান মানুষের অন্তরে এই কথা ঢেলে দেয় যে, তুমি যে আকার ও আকৃতি তোমার ধ্যানে দেখছো, এটি হুবহু আল্রাহরই আকৃতি।  এরপরে তাকে বাতিল আকৃতি দেখায়। নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর আকার ও আকৃতির বিশ্বাস থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহর আকার ও আকৃতি আছে, এধরনের বাতিল বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল করে দেয়।  কখনও এমন হয় যে এই মূর্খ আসমান ও জমিনের মাঝে একটি সিংহাসন বসা বিভিন্ন আকৃতি  দেখতে পায় । বিষয়টি হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। মূর্খ লোকটি আগুন ও সিংহাসন দেখে ধোকায় পড়ে যায়। সে একে নিজের প্রভূ মনে করে সিজদা করতে শুরু করে। এভাবে সে মুজাসসিমা (দেহবাদী) ফেরকার নিকৃষ্ট আকিদায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। “

[ইমদাদুস সুলুক, পৃ.১৯১]

স্ক্রিনশট:

image

পরবর্তীতে  তিনি লিখেছেন,

” দেহবাদী নিকৃষ্ট আকিদার মুসীবত থেকে বাচার জন্য গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমদের নিকট শ্রেষ্ঠ দলিল রয়েছে। এসব দলিলের সারকথা হলো, সমস্ত নবী, পূরবর্তী সমস্ত উম্মত, বর্তমানের সকল মু’মিন-মুসলমান, সমম্ত আলেম ও শায়খ, ছোট-বড় সকলেই এক বাক্যে এ বিষয়ের উপর ঐকমত্য পোষণ করেছে এবং এ ব্যাপারে সকলের ইজমা রয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা ও গুণাবলী জিসম বা  দেহ থেকে পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট সমস্ত সৃষ্টি ও এর আপেক্ষিক উপাদানের কোন কিছুর সাথে ন্যুনতম কোন সাদৃশ্য রাখেন না। সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর নতুন অস্তিত্ব দানের মাধ্যমে অস্তিত্ব এসেছে। এগুলো আল্লাহ তায়ালাই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এগুলোর স্রষ্টা, তিনি অনাদি ও অনন্ত। স্পষ্ট কথা হলো,  একটি বাতিল বিষয়ের আল্লাহর সকল প্রিয় বান্দাদের ঐকমত্য ও ইজমা কীভাবে হতে পারে? কখনও এটি হতে পারে না। সুতরাং এই মূর্খের আকিদা মূলত ভ্রান্ত। 

[ইমদাদুস সুলুক, পৃ.১৯১-১৯২]

হুলুলের আকিদা খন্ডন:

===========

শয়তান অনেক মূর্খকে হুলুলের আকিদায় ফেলে দেয়।  শয়তান তার অন্তরে বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা দিতে থাকে।  অমূলক চিন্তা-ভাবনায় তাকে নিমজ্জিত করার চেষ্টা করে। শয়তানের এসব ভ্রান্ত প্ররোচনায় সে নিকৃষ্ট আকিদা-বিশ্বাসকে সঠিক মনে করতে শুরু করে।  উদাহরণস্বরূপ, শয়তান তাকে বলে, তোমার অন্তরাত্মায় যেসব অপ্রাকৃতিক জিনিস অবলোকন করছে এগুলো তোমারই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা। এজন্য তোমার বহির্জগতে এগুলো দেখতে পাও না। এরপর যখন সে ধ্যানে নিমগ্ন হয়, তখন নিজের অভ্যন্তরীণ কোন অপ্রাকৃতিক বস্তু দেখে, তখন সে মনে করে এগুলো তার অন্তরাত্মারই অংশ।  মোরাকাবার সময় তার অন্তরে যে নূর দেখে একে সে নিজের অন্তরের অংশ মনে করে। ফলে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রবেশ করেছেন।  আমরা এধরনের নিকৃষ্ট বিশ্বাস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। 

অনেক সময় কোন মূর্খের উপর যখন আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হয়, তখন তার হাতে বিভিন্ন কারামত ও অলৌকিক জিনিস প্রকাশ পেতে শুরু করে। এ অবস্থায় শয়তান তার অন্তরে কু-মন্ত্রনা দেয় যে, তোমার এই আধ্যাত্মিক অবস্থাটা মূলত: আল্রাহ তায়ালাই। আল্লাহ তায়ালা তোমার মাঝে প্রবেশ করেছেন এবং এভাবে তার ক্ষমতা  ও কুদরত প্রকাশ করছেেন। তখন এই মূর্খ শয়তানের ধোকায় পড়ে হুলুলের আকিদা রাখতে শুরু করে। ।

[ইমদাদুস সুলুক, পৃ.১৯২]

গাঙ্গুহী রহ. হুলুলের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে আলোচনা করে লেখেন,

“স্পষ্টত: আল্লাহ তায়ালা সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন, তিনি সকল বস্তুর সাথে রয়েছেন, তিনি সব কিছুর নিকটবর্তী। অণু পরিমাণ বস্তুও আল্রাহর নিকট গোপন নয়। আসমান বা জমিনের একটি পরমাণুও আল্লাহর কাছে গোপন নয়। এরপরও আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে পৃথক। সমস্ত মাখলুক বা সৃষ্টি আল্লাহর থেকে পৃথক। আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে মাখলুক প্রবেশ করা কিংবা কোন মাখলুকের মাঝে আল্লাহর প্রবেশ করা, দু’টোই অসম্ভব।  সমস্ত নবী, ওলী ও উলামা হুলুলের আকিদার বিরোধী।  এ বিষয়ে তারা সকলেই একমত। সুতরাং হুলুলের আকিদায় বিশ্বাসী এক ব্যক্তির আকিদা কীভাবে গ্রহনযোগ্য হতে পারে? সুতরাং এই আকিদা ভালভাবে স্মরণ রাখবে। “”

[ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯৪]

রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. আকিদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে খুবই উচ্চাঙ্গের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মুজাসসিমাদের কুফুরী আকিদা সম্পর্কে লিখেছেন,

” অনেক মূর্খের সাথে শয়তান এধরনের আচরণ করে যে, প্রথমে তার অন্তরে এই কথাটি ঢেলে দেয়, আল্লাহ তায়ালা যে কোন আকৃতিতে আত্ম প্রকাশ করেন। এটি আল্লাহর আকৃতি। এই মূর্খ লোকটি যখন অন্তর থেকে এই বিশ্বাস লালন করতে শুরু করে, তখন সে মুজাসসিমা ফেরকার অন্তর্ভূক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।  অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করে সে কাফের হয়ে গেছে। [ ইমদাদুস সুলুক, পৃ.১৮৭]

মূল কিতাবের ডাউনলোড লিংক:

https://ia601000.us.archive.org/29/items/ImdadUsSulookByShaykhRasheedAhmadGangohir.a/ImdadUsSulookByShaykhRasheedAhmadGangohir.a.pdf

মূল কিতাবের স্ক্রিনশট:

image

image

image

উপরের আলোচনা  থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, দেওবন্দী আকিদা হুলুল ও ইত্তেহাদের আকিদা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। দেওবন্দী আকিদা মুজাসসিমা আকিদা থেকে মুক্ত থেকে। স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক, এটি  কখনও দেওবন্দী আকিদা নয়। দেওবন্দী আকিদার সাথে এধরনের বক্তব্যের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। যারা মিথ্যাচারের মাধ্যমে এসব আকিদাকে দেওবন্দী আকিদা বলে প্রচার করে দেওবন্দী আলেমদের বদনাম করার চেষ্টা করে, এদের বিচারের ভার মহান আল্লাহর দরবারে ন্যস্ত করছি। তিনি মিথ্যুক ও অপবাদদাতাদের যথার্থ শাস্তি দিবেন। 

য়াহদাতুল উজুদ সম্পর্কে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. এর বক্তব্য

=====================================

১. স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে এক মনে করা কুফুরী:

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. তার ” রিসালা দর বয়ানে ওয়াহদাতুল উজুদ” নামক পুস্তকে  লিখেছেন, 

” জেনে রেখো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও সৃষ্টির মাঝে প্রকৃত একাত্মতার কথা বলে এবং উভয়ের মাঝে সব ধরনের পার্থক্য অস্বীকার করে, সে কাফের, ধর্মদ্রোহী ও মুরতাদ। আবেদ (ইবাদতকারী বান্দা) ও মা’বুদ (আল্লাহ), সাজিদ (সেজদাকারী বান্দা) ও মাসজুদ ( যার জন্য সেজদা করা হয় অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা) এর মাঝে পার্থক্য না করার এই আকিদা বাস্তবতা বিরোধী।  আমরা এধরনের কুফুরী আকিদা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি”

[কুল্লিয়াতে ইমদাদিয়া, পৃ.২২২]

এধরনের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য থাকার পরও যারা এসব বুজুগর্দের নামে মিথ্যাচার করে, তাদের পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। 

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. আরও লিখেছেন, 

” গবেষক আলেমদের বক্তব্য ও পরিভাষা অনুযায়ী স্রষ্টা ও সৃষ্টি অস্তিত্বের দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন। স্রষ্টা সৃষ্টি হয়ে যাননি, কিংবা সৃষ্টি স্রষ্টা হয়ে যায়নি। আল্লাহ তায়ালা আল্লাহই রয়েছেন। সৃষ্টি সৃষ্টিই রয়েছে। সৃষ্টি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে, সৃষ্টির অস্তিত্ব অপূর্ণ ও অধীন। কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্ব অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহর অস্তিত্ব স্বাধীন ও পরিপূর্ণ। এটিই ওয়াহদাতুল উজুদের বাস্তবতা। এ সম্পর্কে ইমাম জা’মী রহ. এর একটি পংক্তি রয়েছে, [অনুবাদ] অস্তিত্বের দিক থেকে  স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয়ের অস্তিত্বেরই ভিন্ন ভিন্ন হুকুম রয়েছে। যদি উভয়ের মাঝে পার্থক্য না করো, তাহলে এটি যিন্দিকী ও ধর্মদ্রোহিতা। “

[কুল্লিয়াতে ইমদাদিয়া, পৃ.২২২]

মূল বইয়ের ডাউনলোড লিংক:

https://ia600708.us.archive.org/2/items/Kulliyat-e-ImdadiyahByHajiImdadullahMuhajirMakkir.a/Kulliyat-e-ImdadiyahByShaykhHajiImdadullahMuhajirMakkir.a.pdf

মূল বইয়ের স্ক্রিনশট:

image

image

image

ইবনে তাইমিয়া রহ: এর দৃষ্টিতে ফানা-ফিল্লাহর ব্যাখ্যা

আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে ওযাহদাতুল উজুদের বিশ্বাসটি সঠিক। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এর বাস্তবতা তখনই উপলব্ধি করা যায়, যখন আল্লাহপর পথের যাত্রী কঠোর পরিশ্রম, সাধনা, অল্প আহার, গভীর মগ্নতা এবং আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু পরিত্যাগের মাধ্যমে যখন আত্মপরিচয় ভুলে যায়, তখন সৃষ্টির কোন কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হয় না। মানুষ যখন এই স্তরে  এসে নিজেকে ভুলে যায়, তখন তার অন্য কোন সৃষ্টির প্রতি খেয়াল থাকে না। তখন সে শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকে। সকল সৃষ্টির অস্তিত্ব থেকে যখন সে মুক্ত হয়ে যায়, তখন আল্লাহর অস্তিত্ব ব্যতীত আর কিছুই দেখে না। তখন সে শুধু আল্লাহর প্রতি মনযোগী থাকে। এ অবস্থায় সে আল্লাহ আল্লাহ বলার পরিবর্তে আনা আনা (আমি, আমি) বলতে শুরু করে। এ অবস্থাকে ফানা দর ফানা বলে। ………..এ অবস্থার কারণে বায়জিদ বোস্তামী বলেছিলো, আমি মহা পবিত্র, আমার মর্যাদা কতো উচু।

এই কথাগুলো ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যায় খুবই স্পষ্ট। একই কথা আরও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম রহ.। আমরা এখানে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করছি।

ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য:

الْفَنَاءَ ثَلَاثَةُ أَنْوَاعٍ ” : نَوْعٌ لِلْكَامِلِينَ مِنْ الْأَنْبِيَاءِ وَالْأَوْلِيَاءِ ؛ وَنَوْعٌ لِلْقَاصِدِينَ مِنْ الْأَوْلِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ ؛ وَنَوْعٌ لِلْمُنَافِقِينَ الْمُلْحِدِينَ الْمُشَبِّهِينَ

. ( فَأَمَّا الْأَوَّلُ ) فَهُوَ ” الْفَنَاءُ عَنْ إرَادَةِ مَا سِوَى اللَّهِ ” بِحَيْثُ لَا يُحِبُّ إلَّا اللَّهَ . وَلَا يَعْبُدُ إلَّا إيَّاهُ وَلَا يَتَوَكَّلُ إلَّا عَلَيْهِ وَلَا يَطْلُبُ غَيْرَهُ ؛ وَهُوَ الْمَعْنَى الَّذِي يَجِبُ أَنْ يُقْصَدَ بِقَوْلِ الشَّيْخِ أَبِي يَزِيدَ حَيْثُ قَالَ : أُرِيدُ أَنْ لَا أُرِيدَ إلَّا مَا يُرِيدُ . أَيْ الْمُرَادُ الْمَحْبُوبُ الْمَرْضِيُّ ؛ وَهُوَ الْمُرَادُ بِالْإِرَادَةِ الدِّينِيَّةِ وَكَمَالُ الْعَبْدِ أَنْ لَا يُرِيدَ وَلَا يُحِبَّ وَلَا يَرْضَى إلَّا مَا أَرَادَهُ اللَّهُ وَرَضِيَهُ وَأَحَبَّهُ وَهُوَ مَا أَمَرَ بِهِ أَمْرَ إيجَابٍ أَوْ اسْتِحْبَابٍ ؛ وَلَا يُحِبُّ إلَّا مَا يُحِبُّهُ اللَّهُ كَالْمَلَائِكَةِ وَالْأَنْبِيَاءِ وَالصَّالِحِينَ . وَهَذَا مَعْنَى قَوْلِهِمْ فِي قَوْلِهِ : { إلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ } قَالُوا : هُوَ السَّلِيمُ مِمَّا سِوَى اللَّهِ أَوْ مِمَّا سِوَى عِبَادَةِ اللَّهِ . أَوْ مِمَّا سِوَى إرَادَةِ اللَّهِ . أَوْ مِمَّا سِوَى مَحَبَّةِ اللَّهِ فَالْمَعْنَى وَاحِدٌ وَهَذَا الْمَعْنَى إنْ سُمِّيَ فَنَاءً أَوْ لَمْ يُسَمَّ هُوَ أَوَّلُ الْإِسْلَامِ وَآخِرُهُ. وَبَاطِنُ الدِّينِ وَظَاهِرُهُ .

“ফানা তিন প্রকার। প্রথম প্রকার নবী ও কামেল ওলীদের ফানা। দ্বিতীয় প্রকার হল, ক্বাসেদীন তথা আল্লাহর ওলী ও সৎকর্মশীলদের ফানা। তৃতীয় প্রকার ফানা হল, মুনাফেক ও ধর্মদ্রোহী সাদৃশ্যদানকারীদের ফানা।প্রথম প্রকারের ফানা হল, গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে নিজের ইচ্ছাকে মিটিয়ে দেয়া অর্থাৎ বান্দা একমাত্র আল্লাহকেই মহব্বত করবে এবং একমাত্র তারই ইবাদত করবে, তার উপরই তাওয়াক্কুল করবে এবং তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না। শায়েখ আবু ইয়াযীদ বুস্তামী (রহঃ) এর উক্তির উদ্দেশ্য এটিই। তিনি বলেন-“আমি কামনা করি যে, তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুর ইচ্ছা করব না” অর্থাৎ  তাঁর প্রিয় ও সন্তুষ্টপূর্ণ ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আর দ্বীনি বিষয়ে যে কোন ইচ্ছার ক্ষেত্রে এটিই কাম্য। বান্দা তখনই কামেল হবে, যখন সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছুর ইচ্ছা করবে না, আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত কোন কিছুতে সন্তুষ্ট হবে না এবং আল্লাহর মহব্বত ব্যতীত কোন কিছুকে মহব্বত করবে না। আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেছেন, তা হয়ত আবশ্যকীয় কিংবা মুস্তাহাব পর্যায়ের। বান্দা আল্লাহ যাকে মহব্বত করেন তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে মহব্বত করবে না, যেমন  ফেরেশতা, নবীগন ও সৎকর্মশীলগণ। পবিত্র কুরআনের নি¤েœর আয়াতের তাফসীরে তারা এটি উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- إلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ (সেদিন কারও সম্পদ ও সন্তান কোন উপকারে আসবে না। তবে যে ব্যক্তি নিষ্কলুষ হৃদয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে)সূফীগণ বলেছেন- আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছু থেকে মুক্ত হৃদয় অথবা আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত অন্য সকল কিছু থেকে মুক্ত, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত সকল কিছু থেকে মুক্ত অথবা আল্লাহর মহব্বত ব্যতীত সকল কিছু থেকে মুক্ত হৃদয়ে যে উপস্থিত হবে। এ সকল অর্থের উদ্দেশ্য এক। আর একে ফানা বলা হয়। এখন কেউ একে ফানা বলুক চাই না বলুক, এটিই মূলতঃ ইসলামের শুরু, এটিই শেষ, এটি দ্বীনের বাহ্যিক (জাহের) এবং এটিই দ্বীনের বাতেন (অভ্যন্তর)।

[মাজমুঊল ফাতাওয়া, খ–১০, পৃষ্ঠা-২১৯]

ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) “ফানার” দ্বিতীয় প্রকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-

وَأَمَّا النَّوْعُ الثَّانِي : فَهُوَ ” الْفَنَاءُ عَنْ شُهُودِ السِّوَى ” . وَهَذَا يَحْصُلُ لِكَثِيرِ مِنْ السَّالِكِينَ ؛ فَإِنَّهُمْ لِفَرْطِ انْجِذَابِ قُلُوبِهِمْ إلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَعِبَادَتِهِ وَمَحَبَّتِهِ وَضَعْفِ قُلُوبِهِمْ عَنْ أَنْ تَشْهَدَ غَيْرَ مَا تَعْبُدُ وَتَرَى غَيْرَ مَا تَقْصِدُ ؛ لَا يَخْطُرُ بِقُلُوبِهِمْ غَيْرُ اللَّهِ ؛ بَلْ وَلَا يَشْعُرُونَ ؛ كَمَا قِيلَ فِي قَوْلِهِ : { وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا } قَالُوا : فَارِغًا مَنْ كُلِّ شَيْءٍ إلَّا مِنْ ذِكْرِ مُوسَى . وَهَذَا كَثِيرٌ يَعْرِضُ لِمَنْ فَقَمَهُ أَمْرٌ مِنْ الْأُمُورِ إمَّا حُبٌّ وَإِمَّا خَوْفٌ . وَإِمَّا رَجَاءٌ يُبْقِي قَلْبَهُ مُنْصَرِفًا عَنْ كُلِّ شَيْءٍ إلَّا عَمَّا قَدْ أَحَبَّهُ أَوْ خَافَهُ أَوْ طَلَبَهُ ؛ بِحَيْثُ يَكُونُ عِنْدَ اسْتِغْرَاقِهِ فِي ذَلِكَ لَا يَشْعُرُ بِغَيْرِهِ . فَإِذَا قَوِيَ عَلَى صَاحِبِ الْفَنَاءِ هَذَا فَإِنَّهُ يَغِيبُ بِمَوْجُودِهِ عَنْ وُجُودِهِ وَبِمَشْهُودِهِ عَنْ شُهُودِهِ وَبِمَذْكُورِهِ عَنْ ذِكْرِهِ وَبِمَعْرُوفِهِ عَنْ مَعْرِفَتِهِ حَتَّى يَفْنَى مَنْ لَمْ يَكُنْ وَهِيَ الْمَخْلُوقَاتُ الْمُعَبَّدَةُ مِمَّنْ سِوَاهُ وَيَبْقَى مَنْ لَمْ يَزُلْ وَهُوَ الرَّبُّ تَعَالَى . وَالْمُرَادُ فَنَاؤُهَا فِي شُهُودِ الْعَبْدِ وَذِكْرِهِ وَفَنَاؤُهُ عَنْ أَنْ يُدْرِكَهَا أَوْ يَشْهَدَهَا . وَإِذَا قَوِيَ هَذَا ضَعُفَ الْمُحِبُّ حَتَّى اضْطَرَبَ فِي تَمْيِيزِهِ فَقَدْ يَظُنُّ أَنَّهُ هُوَ مَحْبُوبُهُ كَمَا يُذْكَرُ : أَنَّ رَجُلًا أَلْقَى نَفْسَهُ فِي الْيَمِّ فَأَلْقَى مُحِبُّهُ نَفْسَهُ خَلْفَهُ فَقَالَ : أَنَا وَقَعْتُ فَمَا أَوْقَعَكَ خَلْفِي قَالَ : غِبْتُ بِكَ عَنِّي فَظَنَنْتُ أَنَّكَ أَنِي

“দ্বিতীয় প্রকার হল, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর দর্শন ও চিন্তা থেকে ফানা হওয়া। এটি অনেক সালেকেরই অর্জিত হয়ে থাকে। কেননা তারা আল্লাহর যিকিরের প্রতি অধিক আসক্তি, অধিক ইবাদত ও মহব্বত এবং অন্তরের মুজাহাদার মাধ্যমে এমন স্তরে উন্নীত হন যে, তাদের অন্তর মা’বুদ ব্যতীত অন্য কিছুকে প্রত্যক্ষ করে না, মা’বুদ ব্যতীত অন্য কারও প্রতি তাদের ক্বলব ধাবিত হয় না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু তাদের কল্পনায়ও আসে না বরং তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু অনুভব করতে পারেন না। যেমন হযরত মুসা (আঃ) এর মা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,“সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হƒদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসা জনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। [সূরা ক্বাসাস-১০]সূফীগণ বলেছেন- তাঁর হৃদয় মুসা (আঃ) এর স্মরণ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। যেমন কেউ অধিক ভয়, মহব্বত কিংবা অধিক আশায় নিপতিত হলে তার অন্তর অন্য সব কিছু থেকে খালি হয়ে যায় এবং তার অন্তর ভয়, মহব্বত কিংবা আশা ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে তার উদ্দিষ্ট বিষয়ে এতটা নিমগ্ন থাকে যে, অন্য কিছুর অস্তিত্বই অনুভব করতে পারে না। “ফানার” অধিকারীর উপর যখন এ অবস্থা প্রবল হয়, তখন সে তার অস্তিত্ব ভুলে যায়, নিজের ধ্যান থেকে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, নিজের কথা ভুলে আল্লাহকে স্মরণ করে এমনকি অস্তিত্বহীন সকল কিছু তাঁর নিকট ফানা হয়ে যায়, অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য যা কিছুর ইবাদত করা সব কিছু অস্তিত্বহীন মনে হয় এবং এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই তাঁর অন্তরে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং মূল উদ্দেশ্য হল, বান্দার ধ্যান থেকে এবং বান্দার স্মরণ থেকে মাখলুকাত ফানা হওয়া এবং বান্দা এ সমস্ত জিনিসের অস্তিত্ব অনুভব কিংবা ধ্যান থেকে ফানা হওয়া। এ অবস্থা যখন প্রবল হয়, তখন প্রেমিক দূর্বল হয়ে পড়ে এমনকি তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতার মাঝে ত্রুটি দেখা যায়, তখন সে নিজেকেই তার প্রেমাস্পদ মনে করতে শুরু করে। যেমন, বলা হয়, এক ব্যক্তি নিজেকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে তার প্রেমিকও তার পিছে পিছে ঝাঁপ দিয়েছে। তখন সে তার প্রেমিককে জিজ্ঞেস করল যে, আমি নিজে পড়েছি, তোমাকে কে নিক্ষেপ করল? সে বলল- তোমার ধ্যানে আমি আমার নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেছি। আমি মনে করেছি তুমিই আমি।”[মাজমুউল ফাতাওয়া, খ–১০, পৃষ্ঠা-২১৯]

ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-

وَفِي هَذَا الْفَنَاءِ قَدْ يَقُولُ : أَنَا الْحَقُّ أَوْ سُبْحَانِي أَوْ مَا فِي الْجُبَّةِ إلَّا اللَّهُ إذَا فَنِيَ بِمَشْهُودِهِ عَنْ شُهُودِهِ وَبِمَوْجُودِهِ عَنْ وُجُودِهِ . وَبِمَذْكُورِهِ عَنْ ذِكْرِهِ وَبِمَعْرُوفِهِ عَنْ عِرْفَانِهِ . كَمَا يَحْكُونَ أَنَّ رَجُلًا كَانَ مُسْتَغْرِقًا فِي مَحَبَّةِ آخَرَ فَوَقَعَ الْمَحْبُوبُ فِي الْيَمِّ فَأَلْقَى الْآخَرُ نَفْسَهُ خَلْفَهُ فَقَالَ مَا الَّذِي أَوْقَعَك خَلْفِي ؟ فَقَالَ : غِبْت بِك عَنِّي فَظَنَنْت أَنَّك أَنِّي . وَفِي مِثْلِ هَذَا الْمَقَامِ يَقَعُ السُّكْرُ الَّذِي يُسْقِطُ التَّمْيِيزَ مَعَ وُجُودِ حَلَاوَةِ الْإِيمَانِ كَمَا يَحْصُلُ بِسُكْرِ الْخَمْرِ وَسُكْرِ عَشِيقِ الصُّوَرِ . وَكَذَلِكَ قَدْ يَحْصُلُ الْفَنَاءُ بِحَالِ خَوْفٍ أَوْ رَجَاءٍ كَمَا يَحْصُلُ بِحَالِ حُبٍّ فَيَغِيبُ الْقَلْبُ عَنْ شُهُودِ بَعْضِ الْحَقَائِقِ وَيَصْدُرُ مِنْهُ قَوْلٌ أَوْ عَمَلٌ مِنْ جِنْسِ أُمُورِ السُّكَارَى وَهِيَ شَطَحَاتُ بَعْضِ الْمَشَايِخِ : كَقَوْلِ بَعْضِهِمْ : أَنْصِبُ خَيْمَتِي عَلَى جَهَنَّمَ وَنَحْوِ ذَلِكَ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الْمُخَالِفَةِ لِلشَّرْعِ ؛ وَقَدْ يَكُونُ صَاحِبُهَا غَيْرَ مَأْثُومٍ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَيُشْبِهُ هَذَا الْبَابُ أَمْرَ خُفَرَاءِ الْعَدُوِّ وَمَنْ يُعِينُ كَافِرًا أَوْ ظَالِمًا بِحَالِ وَيَزْعُمُ أَنَّهُ مَغْلُوبٌ عَلَيْهِ . وَيَحْكُمُ عَلَى هَؤُلَاءِ أَنَّ أَحَدَهُمْ إذَا زَالَ عَقْلُهُ بِسَبَبِ غَيْرِ مُحَرَّمٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمْ فِيمَا يَصْدُرُ عَنْهُمْ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَفْعَالِ الْمُحَرَّمَةِ بِخِلَافِ مَا إذَا كَانَ سَبَبُ زَوَالِ الْعَقْلِ وَالْغَلَبَةِ أَمْرًا مُحَرَّمًا . وَهَذَا كَمَا قُلْنَا فِي عُقَلَاءِ الْمَجَانِينِ والمولهين الَّذِينَ صَارَ ذَلِكَ لَهُمْ مَقَامًا دَائِمًا كَمَا أَنَّهُ يَعْرِضُ لِهَؤُلَاءِ فِي بَعْضِ الْأَوْقَاتِ كَمَا قَالَ بَعْضُ الْعُلَمَاءِ ذَلِكَ فِي مَنْ زَالَ عَقْلُهُ حَتَّى تَرَكَ شَيْئًا مِنْ الْوَاجِبَاتِ . إنْ كَانَ زَوَالُهُ بِسَبَبِ غَيْرِ مُحَرَّمٍ مِثْلِ الْإِغْمَاءِ بِالْمَرَضِ أَوْ أُسْقِيَ مُكْرَهًا شَيْئًا يُزِيلُ عَقْلَهُ فَلَا إثْمَ عَلَيْهِ وَإِنْ زَالَ بِشُرْبِ الْخَمْرِ وَنَحْوِ ذَلِكَ مِنْ الْأَحْوَالِ الْمُحَرَّمَةِ أَثِمَ بِتَرْكِ الْوَاجِبِ وَكَذَلِكَ الْأَمْرُ فِي فِعْلِ الْمُحَرَّمِ . وَكَمَا أَنَّهُ لَا جُنَاحَ عَلَيْهِمْ فَلَا يَجُوزُ الِاقْتِدَاءُ بِهِمْ وَلَا حَمْلُ كَلَامِهِمْ وَفِعَالِهِمْ عَلَى الصِّحَّةِ بَلْ هُمْ فِي الْخَاصَّةِ مِثْلُ الْغَافِلِ وَالْمَجْنُونِ فِي التَّكَالِيفِ“

এ ফানার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সূফীগণ বলেছেন, আমি হক্ব (আল্লাহ), আমার সত্ত্বা সুমহান, অথবা আমার জামার নিচে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই ন্য়। যখন তারা নিজের ধ্যান থেকে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, নিজের অস্তিত্ব থেকে আল্লাহর অস্তিত্বে নিমজ্জিত হয়, নিজের স্মরণ থেকে আল্লাহর স্মরণে অবগাহন করে এবং নিজের মা’রেফাত থেকে আল্লাহর মা’রেফাতে ডুব দেয় তখন এ ধরণের পরিস্থিতির স্বীকার হয়। যেমন, ঘটনা বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তি অন্য কারও মহব্বতে নিমজ্জিত ছিল। কোন একদিন প্রেমাস্পদ সাগরে পড়ে গেলে প্রেমিকও তার পিছে পিছে নিজেকে সাগরে নিক্ষেপ করল। প্রেমাস্পদ জিজ্ঞেস করল, তোমাকে কে ফেলল? তখন সে বলল, আমি তোমার মাঝে হারিয়ে গেছি, আমি মনে করেছি, তুমিই আমি। এ অবস্থায় মানুষের মাঝে মাতাল অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা তার বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা দূর করে দেয়, কিন্তু ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে থাকে, যেমন মদ্যপ ব্যক্তি মদের স্বাদ এবং গাইরুল্লাহর প্রেমিক তার প্রেমের স্বাদ আস্বাদন করে। কখনও ভয় ও আশার কারণে “ফানা” এর অবস্থা সৃষ্টি হয়, যেমন মহব্বতের কারণেও ফানার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় অন্তর কিছু কিছু হাকীকত বুঝতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং তার থেকে এমন কিছু কাজ বা কথা প্রকাশ পায়, যা মাতালদের থেকে পাওয়া যায়। 

ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন

-“قد يقع بعض من غلب عليه الحال في نوع من ا لحلول والاتحاد .. لماورد عليه ماغيب عقله أولإناه عما سوى محبوبه, ولم يكن ذلك بذنب منه كان معذورًا غير معاقب عليه مادام غيرعاقل… وهذا كما يحكى : أن رجلين كان أحدهما يحب الآخر فوقع المحبوب في اليم , فألقى الآخر نفسه خلفه فقال: أناوقعت, فما الذي أوقعك ؟ فقال: غبت بك عني, فظننت أنك أني.

فهذه الحال تعتري كثيرً امن أهل المحبة والإرادة في جانب الحق, وفي غيرجانبه… فإنه يغيب بمحبوبه عن حبه وعن نفسه , وبمذكوره عن ذكره… فلا يشعر حينئذ بالتميز ولابوجوده , فقد يقول في هذه الحال : أنا الحق أوسبحاني أومافي الجبة إلا الله ونحوذلك …

“কিছু মাজযুবের উপর যখন তাদের হালত প্রবল হয়ে যায়, তাদের থেকে এমন কিছু কথা প্রকাশ পায় যা “হুলুল” (অনুপ্রবেশ) ও ইত্তেহাদ (সত্ত্বাগত একাত্মতা) এর অন্তর্ভূক্ত। তার উপর আরোপিত বিষয়ের কারণে তার আক্বল চলে যায়, অথবা তাঁর মাহবুবের প্রতি প্রবল আসক্তির কারণে। এটি তার পক্ষ থেকে কোন গোনাহর কারণে নয়। এক্ষেত্রে তিনি মা’জুর এবং যতক্ষণ তিনি আক্বলহীন থাকবেন ততক্ষণ কোন শাস্তির যোগ্য হবেন না। তাদের অবস্থা ঐ ব্যক্তির ঘটনার মত যার সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, দু’ব্যক্তি  একে অপরকে মহব্বত করত। প্রেমাস্পদ সাগরে পড়ে গেলে প্রেমিকও সাগরে পড়ে যায়। তখন প্রেমাস্পদ বলল, আমি পড়ে গেছি, তোমাকে কে ফেলল? প্রেমিক বলল- আমি তোমার মাঝে হারিয়ে গেছি, আমি ধারণা করেছি, আমি তুমিই।…এ সমস্ত অবস্থা মহব্বত ও ইরাদার অধিকারী অনেককে হকের পথে পরিচালিত করে, অনেককে তা অন্য দিকে পরিচালিত করে। কেননা সে তার প্রেমাস্পদের মাঝে হারিয়ে যায় এমনিক নিজের প্রেম ও অস্তিস্ত¡ সম্পর্কে ভুলে যায়, যিকিরের মাধ্যমে সে আল্লাহর ইশকের মাঝে হারিয়ে যায়, তখন তার কোন পার্থক্য জ্ঞান থাকে না  এবং সে নিজের অস্তিস্ত¡ বুঝতে পারে না। এ অবস্থায় কখনও তারা বলে থাকে যে, আমি হক্ব, আমার সত্ত্বা মহান, অথবা আমার জামার নিচে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছ্ইু নয় ইত্যাদি।  [মাজমুউল ফাতাওয়া, খ–২, পৃষ্ঠা-৩৯৬]

------ ------

এই বিষয়ে আরও জানতে চান?

আমাদের ইফতা বিভাগে সরাসরি প্রশ্ন করুন। অভিজ্ঞ মুফতিগণ আপনার ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেবেন — সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার সাথে।

নির্ভরযোগ্য গোপনীয় দ্রুত উত্তর

মন্তব্য 0

আপনার মন্তব্য জানান
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্যকারী হোন! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান।

লেখকের আরো ব্লগ

আক্বিদা

সালাফী আক্বিদা কেন বাতিল এবং সালাফীরা কেন পথভ্রষ্ট?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 72
আক্বিদা

মিলাদ ইত্যাদি নিয়ে এতো এতো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, এটা ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?

ইজহারুল ইসলাম · 14 মার্চ, 2026 · 79
ফিকহ

তারাবীর নামাযের ইমামতির হাদিয়া গ্রহণ: শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইজহারুল ইসলাম · 13 মার্চ, 2026 · 685
আক্বিদা

ইবনে উমর রা: এর শানে ইবনে তাইমিয়ার বেয়াদবি ও শিরকের অপবাদ (১ম পর্ব)

ইজহারুল ইসলাম · 30 জুন, 2023 · 83